পথচারীবান্ধব আরও বেশি রাস্তার কথা ভাবছে টরন্টো

পথচারীবান্ধব আরও বেশি রাস্তার কথা ভাবছে টরন্টো - the Bengali Times
এমন কিছু রাস্তা গড়ে তোলা হবে যেখানে মানুষ দোকান রেস্তোরাঁ কিংবা ক্যাফে থেকে বেরিয়ে নির্ভয়ে হাঁটতে পারবেন

নগরজীবনকে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় ও প্রাণবন্ত করে তুলতে টরন্টো সিটি কর্তৃপক্ষ এবার আরও বেশি সংখ্যক পথচারীবান্ধব বা কারমুক্ত রাস্তা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এমন কিছু রাস্তা গড়ে তোলা হবে যেখানে মানুষ দোকান, রেস্তোরাঁ কিংবা ক্যাফে থেকে বেরিয়ে নির্ভয়ে হাঁটতে পারবেন। রাস্তা পার হতে ট্রাফিকের চাপ বা সিগন্যাল পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে না। এর মাধ্যমে শহরের ব্যস্ত এলাকাগুলোকে শুধু যান চলাচলের পথ নয়, বরং মানুষের মিলনস্থল ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে প্রশাসন।

বর্তমানে টরন্টোতে এমন রাস্তার সংখ্যা খুবই সীমিত, যেখানে টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় যানবাহন চলাচল বন্ধ রেখে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। এর মধ্যে সেন্ট লরেন্স মার্কেট সংলগ্ন মার্কেট স্ট্রিট এবং ওয়েলেসলি ও অ্যালেক্সান্ডার স্ট্রিটের মধ্যবর্তী চার্চ স্ট্রিট নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যানবাহনমুক্ত রাখা হয়েছে। চার্চ স্ট্রিটটি চলতি বছরের ২১ আগস্ট পর্যন্ত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

- Advertisement -

গত ১৯ জুন চার্চ স্ট্রিটে পরীক্ষামূলকভাবে কারমুক্ত ব্যবস্থা চালুর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে টরন্টো সিটি কাউন্সিলে আলোচনা শুরু হয়। কাউন্সিলররা মৌসুমি এবং স্থায়ী উভয় ধরনের পথচারীবান্ধব রাস্তার সংখ্যা বাড়ানোর পক্ষে মত দেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছর থেকেই নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হতে পারে। এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন ওয়ার্ড ১২-এর কাউন্সিলর জশ ম্যাটলো। সিটি কাউন্সিলে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটি ১৬-৬ ভোটে অনুমোদিত হয়, যা বিষয়টিতে জনপ্রতিনিধিদের শক্তিশালী সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়।

এক সাক্ষাৎকারে কাউন্সিলর জশ ম্যাটলো বলেন, শহরে আরও বেশি পথচারীবান্ধব রাস্তার চাহিদা দীর্ঘদিনের। তাঁর মতে, কানাডার অন্যান্য বড় শহর, বিশেষ করে মন্ট্রিয়লের তুলনায় টরন্টো এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক বড় শহরে পথচারীদের জন্য নির্ধারিত রাস্তাগুলো এখন জনপ্রিয় সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মানুষ সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে, পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে কিংবা অবকাশ যাপনের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে যান। কিন্তু টরন্টোতে এমন জায়গার সংখ্যা এখনও খুবই কম।

ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর জিওগ্রাফি অ্যান্ড প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক পল হেস মনে করেন, শহরের আরও অনেক রাস্তা পথচারীবান্ধব করে তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রতিটি এলাকার ভৌগোলিক অবস্থা, যান চলাচলের চাপ, স্থানীয় ব্যবসা এবং বাসিন্দাদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তাঁর মতে, সব রাস্তার জন্য একই ধরনের সমাধান কার্যকর হবে না। কোথাও মৌসুমি কারমুক্ত এলাকা, কোথাও সপ্তাহান্তভিত্তিক উদ্যোগ, আবার কোথাও স্থায়ীভাবে যানবাহনমুক্ত রাস্তা এভাবে বিভিন্ন মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, পথচারীবান্ধব রাস্তা শুধু মানুষের হাঁটার সুবিধাই বাড়ায় না, বরং স্থানীয় অর্থনীতিকেও চাঙ্গা করে। যখন মানুষ নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশে সময় কাটানোর সুযোগ পান, তখন আশপাশের দোকান, ক্যাফে ও রেস্তোরাঁয় ক্রেতার সংখ্যা বাড়ে। একই সঙ্গে বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ কমে এবং শহরের পরিবেশ আরও বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। বিশ্বের বিভিন্ন শহরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এ ধরনের উদ্যোগ নগরবাসীর সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করে। সিটি কাউন্সিলের অনুমোদনের পর এখন প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হবে কোন কোন রাস্তা নতুন করে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করা। আগামী বছর থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হলে টরন্টোর নগর চিত্রে নতুন পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

টরন্টোর এই উদ্যোগ মূলত আধুনিক নগর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। গত কয়েক বছরে বিশ্বের অনেক বড় শহর যানবাহনকেন্দ্রিক পরিকল্পনা থেকে সরে এসে মানুষকেন্দ্রিক নগর গড়ে তোলার দিকে ঝুঁকেছে। টরন্টোর ক্ষেত্রেও সেই প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। যদিও কারমুক্ত রাস্তা চালুর ফলে কিছু এলাকায় যানজটের চাপ অন্য রাস্তায় স্থানান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তবুও সঠিক পরিকল্পনা ও বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এর ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি হতে পারে। বিশেষ করে গণপরিবহন, সাইকেল অবকাঠামো এবং হাঁটার উপযোগী পরিবেশ একসঙ্গে উন্নত করা গেলে শহরের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। সব মিলিয়ে, টরন্টোর নতুন এই পরিকল্পনা শুধু রাস্তা ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন নয়; বরং নগরবাসীর জীবনধারা, পরিবেশ এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও প্রাণবন্ত ও টেকসই করার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles