
বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে স্টাফ রুমে বসেছিলাম। আমার এক কলিগ রুমে ঢুকেই বলল, “জাভেদ, ঘটনা তো সুবিধার না!”
“কী হইছে?”
“ফা..ং” কানাডা গোল খাইছে”
“বলো কী!”
“ফা..ং বজনিয়ার কাছে! ফা.. ফা..! আমি চললাম, বাসায় গিয়ে বাকি খেলা দেখবো। ফা..ং কাজ! এতো বড়ো খেলা না খেলে কী করতেছি আমি! যে যাই বলুক আমি গেলাম। অফিসের গুষ্টি কিলাই। ফা.. অফিস!”
“সাবধানে ড্রাইভ কইরো”
“শুভ সপ্তাহান্ত”
“তোমাকেও।”
সে সম্ভবত আমাদের ডিপার্টমেন্টের ত্রিশজন কর্মীর মধ্যে দ্বিতীয় ফুটবল ফ্যান। আরেকজন আমি। তার সাথে ফুটবল নিয়ে টুকটাক আলাপ হয়। অনেক জ্ঞান রাখে। এদেশে ফুটবল খুব অজনপ্রিয় খেলা। এরা মেতে থাকে বাস্কেটবল, হকি, বেসবল, গল্ফ নিয়ে।অবশ্য তার সকার ফ্যান হবার পেছনে বংশগত ইতিহাস আছে; তার পূর্ব পুরুষ এসেছিল জার্মানী থেকে। অফিসের বাকিরা ফুটবলের নাম শুনলেই মুরগী ডিম পাড়লে যেমন ক্কক.. ক্কক.. ক্কক.. করে বারবার জানান দেয়; তেমনি এরা” ফা.. ফা.. ফা..” শব্দে বিরক্তি প্রকাশ করে।
.
ঘরির দিকে তাকালাম।
অফিসের ইউনিয়ন সংক্রান্ত জটিলতার কারনে আমরা সাধারণত বিকাল চারটার আগে বের হই না। যদিও অফিসিয়াল ছুটি সাড়ে চারটা।
হঠাৎ আমিও কি মনে করে পৌনে চারটায় “ফা..” বলে উঠে দিলাম ছুট!
রাস্তা বেশ ফাঁকা।
ব্যাংক স্ট্রিটের কন্সট্রাকশন কাজের জ্যামের ফাঁক-ফোকর গলে বের হয়ে এগুতে লাগলাম দ্রুত। অন্যদিন হলে দয়া দেখিয়ে অন্যদের সাইড দিতাম। আজ “রাখ তোর ভদ্রতা” বলে স্বার্থপরের মতো রিভারসাইড রোডে উঠে ষাট কিলোমিটার গতি উপেক্ষা করে আশিতে তুলে ৪১৭ হাইওয়ে তে উঠে একশো বিশ কিলোমিটার গতিতে ছুটলাম বাসার দিকে। অন্যদিন হলে বাসায় পৌঁছাতে লাগতো কমপক্ষে চল্লিশ মিনিট। আর আজ জিপিএস এ দেখাচ্ছে বিশ মিনিট।
লোকজন কি খেলা দেখছে?
এই সুযোগে গিন্নীকেও তার কর্মস্হল থেকে তুলে বাসায় পৌঁছে দেখি খেলা তখনো চল্লিশ মিনিট বাকি!
কানাডা’র সাথে বজনিয়া-হার্জেগোভিনার খেলা জমে গেছে। বিত্ত দখিনা যারা জীবনেও ফুটবল নিয়ে আগ্রহ দেখায় না, তারা পর্যন্ত উত্তেজিত হয়ে টেলিভিশনের সামনে বসা!
কানাডা গোল খেলেও চাপিয়ে রেখেছে।
আমরা “দে গোল দে” বলে হাত পা ছোঁড়াছুঁড়ি করতেই সত্যি কানাডা গোল দিয়ে সমতা ফিরিয়ে আনলো! আমাদের আর পায় কে! গগনবিদারী বাঙালি চিৎকার দিয়ে সবাই লাফিয়ে উঠলাম! চিল্লাতে চিল্লাতে আমরা পাগল হয়ে গেলাম! বংশগত।
প্রতিবেশীরা কি ভাবছে কে জানে!
নিজের দেশ বলে কথা।
এতো ভালোবাসা কোথায় লুকিয়ে থাকে?
অটোয়া, কানাডা

