
এখনো বাতাসে বারুদের গন্ধ লেগে আছে। এখনো চোখ বুজলে ত্রিশ বত্রিশ ঘণ্টা লণ্ডভণ্ড করা একটানা মেশিনগানের শব্দ শুনি। ভূমিকম্প কেমন করে ভুবন কাঁপায় সে অভিজ্ঞতা হয়নি কখনো। তবুও ইত্তেফাক, শহীদ মিনার, কালী মন্দির উড়িয়ে দিতে সবুজ ট্যাঙ্কের গোলা কিভাবে কাঁপিয়েছিল ঢাকার ইমারত আর টিনের চাল সে খবর আমার জানা আছে। চারিদিকে আগুন জ্বেলে জীবন্ত মানুষদের আটকে রাখলে তাদের আর্তনাদ কত তীব্র হয় তা কারোর বলে দিতে হবে না। আমি ১৯৭১ সাল দেখেছি। আমি ইতিহাসের পাতায় দাঁড়িয়ে থাকা অক্ষরগুলো নিজ হাতে নেড়েচেড়ে দেখি।
যখন সময় ছিল বই-কলম নিয়ে ঘুরে বেড়াবার, পাড়ার অন্য বালকদের সাথে হাঁটুতে ক্ষত বানিয়ে ফুটবলের পিছনে দৌড়ে বেড়াবার। যে বয়সে পলিদের দোতলা নেটের ভেতর থেকে পলি, মেরী আর বিউটি আপাকে দেখার কথা। সে-বয়সে আমি এস.এল.আর. হাতে ঘুরে বেড়িয়েছি। হাঁটুতে ক্ষত বানিয়েছি, বল খেলে নয় ক্রলিং দিতে দিতে। আর পলিকে দোতলার বারান্দায় না খুঁজে গাছের লতাপাতার ভেতর দিয়ে খবিস লোকগুলোকে খুঁজে বেড়িয়েছি।
স্বর্গ থেকে মায়ের পেটে চড়ে পৃথিবীতে এসেছিলাম। পা যখন মাটি খুঁজছিল, বাংলার মাটি তার বুক পেতে দিলো। বাংলার বুকের ওপর তুলতুলে নরম পা দিয়ে দুলে দুলে হাঁটতে শিখলাম। মা আর মাটি দু’জনের স্নেহে বেড়ে উঠলাম। আমার তুলতুলে পা শক্ত হলো। দৌড়াতে লাগলাম মাটির বুকের ওপরে। শুধু কি দৌড় ! ছুটোছুটি করলাম। সেই যে বুকে তুলে নিলো আর কখনো ফেলে দিলো না মাটি।
একদিন একটা বিপদ এল। যে-মাসকে মার্চ মাস বলে, সেই মাসের পঁচিশতম রাতে এল সেই বিপদ। মেশিনগান আর কামানের গোলার শব্দে মাটির বুক কেঁপে উঠল। যাদের শরীরে মাটি লেগে ছিল সে মানুষগুলো কেঁপে উঠল। সংস্কৃতি কেঁপে উঠল। ভাষা কেঁপে উঠল। সবার ঘুম ভেঙে গেল। সবাই খেলা ভুলে গেল। পলিদের ভুলে গেল। আমিও সব ভুলে গিয়ে হাওর বিল নদী নালা চর ডোবা পাড়ি দিয়ে জসীম উদ্দীনের ছোট্ট গাঁয়ে গিয়ে উঠলাম। সেখানে গিয়ে দেখি ছাত্রকে কেউ ছাত্র বলে ডাকে না। কৃষককে কেউ কৃষক বলে না, পুলিশকে কেউ পুলিশ বলে না। ওদের সবার একটাই নাম ‘মুক্তিবাহিনী’। খুব কাছে দাঁড়িয়ে আমি একটি মুক্তি দেখলাম। হাবিব ছিল তার নাম। বছরটি (১৯৭১) শেষ হবার পনের দিন আগ পর্যন্ত স্টেনগান দিয়ে পাহারা দিয়েছে আমাদের বংশ নামক ইজ্জতটাকে। যেখানে আমার মা বোন চাচা-চাচী সহ ছিল অনেকগুলো অসহায় জীবন। আমি একটি মুক্তির কাছে কৃতজ্ঞ। স্টেনগান কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা সেই বীর পুরুষটির কাছে কৃতজ্ঞ।
দলের রসদ আনতে একদিন সেই বীরপুরুষ কমান্ডার হাবিব কিছু মুক্তিকে ইণ্ডিয়া পাঠাচ্ছিল। এদিকে তথাকথিত পাক পবিত্র লোকগুলো এবং তাদের এই দেশি খালাতো মামাতো ভাইদের জন্য আমরা যাযাবর হয়ে গিয়েছিলাম। মরুভূমিতে জন্ম না নিয়েও ’৭১-এ আমরা যাযাবর জীবন কাটিয়েছি। কখনো ধানক্ষেতে ফড়িং আর চীনা জোঁকদের সাথে। আবার কখনো পাটের খসখস পাতার ভেতর চোরের মত লুকিয়ে থেকেছি। কোনকিছু চুরি না করেও ’৭১ সালে আমরা চোরের মতো ঘুরে বেড়িয়েছি। জীবন যখন কচু পাতার পানির মতো হয়ে গেল, মা তখন সিদ্ধান্ত নিলেন, বাবা আর আমিও যাবো হাবিবের দলের সাহসী ছেলে নওশের সাথে। তখন সময় হয়ে গেছে ধানের ফড়িঙের সাথে নয়, পিতলের চকচকে ফড়িং দিয়ে শব্দ তোলার।
এক পূর্ণিমার রাতে মুক্তিদের নৌকা বাড়ির ঘাটে এসে ভিড়ল। বাবা নৌকার ভেতর গিয়ে বসলেন। একমাত্র ছেলের হাত কমান্ডার হাবিবের হাতে তুলে দিয়ে মা বললেন, আল্লাহর নামে তোমার হাতে তুলে দিলাম। ছেলে আমার মাত্র ক্লাস টেনে পড়ে। এরপর আর কিছু বলতে পারেননি আমার মা। যদিও তার গলা ধরে এসেছিল তবু এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলেন নি। আমরা চলে যাবার পর ‘চরমপত্র’, ‘জল্লাদের দরবার’, আর ‘একটি ফুলকে বাঁচানো’র গান শুনতেন। সকলে তাঁর চোখের দিকে চেয়ে কি যেন বুঝতে চাইতো। অথচ তিনি ট্রানজিস্টারের দিকে চেয়ে চেয়ে যেন কার সাথে সারাক্ষণ কথা বলতেন। কোন আতঙ্ক ছিল না। কোন ভয় ছিল না আমার মায়ের। শুধু অপেক্ষা ছিল। সে অপেক্ষা আরও ব্যাকুল হলো ডিসেম্বরের গোঁড়ার দিকে। ষোলই ডিসেম্বরে লিকলিকে স্বাস্থ্যের অধিকারী ছরো মাস্টার (ছরো কাকা) দৌড়ে এসে খবর দিল “দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। যুদ্ধ শেষ। এখন সবার দেশে ফেরার পালা”। সেই প্রথম ঘরের ভিতর গিয়ে মা বালিশে মুখ লুকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সে কি কান্না! একজন বাতাস করে তো, অন্যজন পানির গ্লাস এগিয়ে ধরে। তিনি বলেন, ‘সবাই ফিরে আসবে, আমার বাবলু যদি ফিরে না আসে’!
মুক্তিযুদ্ধকে গৌরবান্বিত করতে যে মায়েরা এগিয়ে এসেছিলেন আমার মা’ও ছিলেন তাঁদের একজন। অনেক ঢেউয়ের সাথে আর একটি ঢেউ যোগ দিয়ে সাগরের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন তিনি। নদীর কলিজা যেমন পানি, মায়ের কলিজার টুকরো তেমনি সন্তান। সেই কলিজার টুকরোদের মায়েরা বলেছিলেন দুধের মতো মাটিতে তুলতুলে পা রাখার ঋণও শোধ করতে হবে। বসুন্ধরা যে মাটি পেতে তোমাদের সোজা হতে দিয়েছিল তার পবিত্র বুকে রাক্ষস হেঁটে বেড়াচ্ছে, যে মাটি বৃষ্টির পানিতে মধুর গন্ধ ছড়ায়, যে মাটিতে তুলতুলে পাগুলো হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে, সে-মাটি খোকন সোনাদের ফোঁটা ফোঁটা রক্তে ভিজে কালো হয়ে যাচ্ছে। মা তাই ছেলেকে পাঠালেন যুদ্ধে। মা রইলেন যুদ্ধের পিছনে। যুদ্ধে গেল বাবা। বাঁশি ছেড়ে রাখাল গেল যুদ্ধে। লাঙ্গল ছেড়ে কৃষক, বই ছেড়ে ছাত্র, ভাই ছেড়ে বোন, স্ত্রী ছেড়েছিল স্বামীকে, পলিরা ছেড়ে দিল বিকেলের রাজপুত্রদের।
এভাবে পলাশীর পর বাংলাতে আরো একটি যুদ্ধ হয়েছিল। সে যুদ্ধের যোদ্ধাদের নামের তালিকা যে চায় সে জানে না সে তালিকা কত বড়। পথের ধারে বসে যে শিশুরা কলস থেকে ঠাণ্ডা পানি খাওয়াত, মসজিদের ভেতর অস্ত্র লুকিয়ে রাখতো যে ইমাম সাহেব, রাতের অন্ধকারে নদী পার করে দিতো যে মাঝি তারা তো কেউ বাদ নেই সে তালিকা থেকে। যত বড় তালিকাই দেখুক না কেন, ঐ সমস্ত পাক পবিত্র নামের লোকগুলো কখনো বাঙালিকে বীর বলে স্বীকার করবে না। ওদের বলে দিন, বাংলা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা মসজিদের মিনারে খোদাই করা, গাছের পাতায় পাতায় ঝুলিয়ে রাখা, বৃষ্টির পানিতে টাপুরটুপুর নেচে বেড়ানো অগণিত নাম। ওরা সংখ্যায় এক সাগর অথবা এক আকাশ নক্ষত্রের মতো।
স্কারবোরো, কানাডা

