
আমি এমন একজন মেয়ে ছিলাম যে কিনা ছোট বেলা থেকেই বোকা, সহজ সরল,অবুঝ ভীরু ধরনের একটা মেয়ে। আমার বোকা বোকা কথা এবং কাজে বাসার সবাই মজা পেতো।আর এই বয়েসে এসে আমার নিজের কথা ভেবে নিজেই মজা এবং লজ্জা দুটোই পাই। মোটামুটি এক কথায় আমি একটা গাধা ছিলাম।কিশোর বয়সে মাঝে মাঝে আম্মাকে এমন সব বোকা প্রশ্ন করতাম আম্মা বিব্রত হয়ে ভাবতেন কি জবাব দেবেন।
১.আমাদের একটা অনেক পরিচিত পরিবার,যাদের সাথে আমার মায়ের বেশ ঘনিষ্টতা ছিলো সে সাথে আমাদেরও ,
তারা অনেক ভাইবোন ছিলো যার ফলে কোন না কোন ভাই বোন আমাদের ভাই বোনদের সাথে একই ক্লাসে পড়তাম।যাইহোক তাদের এক কলেজ পড়ুয়া খালা তাদের সাথে থেকে পড়াশুনা করতো। আম্মাকে আপা বলে ডাকতেন। সে খালা মাঝেমধ্যে আম্মার সাথে গল্প করতে আসতেন।একদিন সে খালা এসে আম্মাকে বললেন ,আপা আমাদের এক স্যারের বাসায় যাবো একটা নোট আনতে ,শিখাকে নিয়ে যাই আমার সাথে? একা যেতে কেমন অস্বস্থি লাগে। আম্মা আপত্তি করলেন না শুধু বললো দেরী করো না তাড়াতাড়ি চলে এসো। আমি খালার সাথে খালার স্যারের বাসায় পৌঁছে গেলাম।বাসায় স্যার ছাড়া আর কাউকে দেখতে পেলাম না।যদিও এতে আমার কিছুই এসে যাচ্ছিল না। স্যার খালা কথা বলছিলেন ,আমার কাজ ছিলো গালে হাত দিয়ে বসে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকা।
একসময় দুজনেই উঠে দাঁড়ালেন,খালা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন একটু বাগানে যাচ্ছি আসবি আমার সাথে? আমি গাছ পাতা নিয়ে পড়াশোনা করি তাই স্যার আমাকে বাগানে কিছু দেখাবেন।আমি কোন জবাব দিলাম না।খালা আবারো বললেন ,আসবি আয়? আমি মুখে প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে বললাম না যাবো না। খালা আর কখা বারালেন না। আমি সে জায়গায় বসেই ছোট একটা বাগান দেখতে পাচ্ছিলাম। কি সব গাছ পাতা দুজন মিলে দেখছিলেন। মাঝে মাঝে স্যার খালার হাত ধরে কিসব বলছিলেন। অবশেষে খালার বিদায় নেবার সময় হলো। আমার প্রচন্ড রাগ হচ্ছিলো খালার উপর ,বেড়াতে আসলাম কিন্তু চা নাস্তা কিছুই খেতে দিলো না।
রিক্সায় উঠে খালা আমাকে বোঝালেন , মা জিজ্ঞেস করলে যেনো বলি স্যারের বউ বাজারে গিয়েছিল তাই নাস্তা দেবার কেউ ছিলো না তাছাড়া দেখলি না পড়া শুনা নিয়ে কতো কথা বলতে হলো কখন চা নাস্তা খেতাম বল?
আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে খালা চলে গেলেন।আম্মা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কিছু খেয়েছো ওখানে? খাবে কিছু? আমি খালার শেখানো কথায় বললাম,স্যারের বউ বেড়াতে গিয়েছিলেন তাই নাস্তা দেবার কেউ ছিলো না।আম্মা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন কিন্তু কিছু বললেন না। খালা আমি বোকা মেয়েটার সামনে প্রেম করে এসেছিলো আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমার একমাত্র কষ্ট ছিলো বেড়াতে গেলাম অথচ নাস্তা খেতে পারলাম না।
২. বাবলী আমাদের পাশের বাসায় আমার ফুফুর বাসায় ভাড়া থাকতো বাবা মা ওদুই বোন সহ।বাবলীর বাবা সিলেট বদলী হয়ে গেলেন হঠাৎ করে।বছরেন মাঝামাঝি সময় ,বাবলী ক্লাস টেনে পড়ে খুব ভালো স্কুলে। এই সময় বাবলীর বাবা মা বাবলীকে নিয়ে টানা হেচরা করতে চাইলেন না কাজেই বাবলীকে স্কুলের হোষ্টেলে ভর্তি করে রেখে গেলেন। এতে বাবলীর মনে কোন কষ্ট দেখতে না পেয়ে আমরা খুব অবাক হয়েছিলাম।আম্মাকে লোকাল অভিবাবকের দায়িত্ব দেয়া হলো। কাজেই প্রতিটি ছুটির দিনে বাবলী আমাদের বাসায় এসে থাকতো।এতে আমাদের খুব আনন্দ হতো।আমাদের বয়েসি একজন মেয়ে বাবলী।আমরা একসাথে গল্প করি ঘুমাই,টিভি দেখি। একদিন বাবলী ওর এক বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে যাবে বললো। আম্মার অনুমতি নিলো বাবলী। আম্মার বহু প্রশ্ন বান্ধবীর কি নাম,বাসা কোথায় ,বাবার নাম কি,ফোন নাম্বার কি? সব জেনে অনুমতি দিলেন যাবার কিন্তু একা যাওয়া যাবে না আমাকেও সাথে যেতে হবে। সতর্ক আম্মাকে হতেই হবে যেহেতু আম্মার দায়িত্বে আছে বাবলী।বাবলী সেদিন বেশ সুন্দর করে সাজগোজ করলো। আরেকটা কথা লিখতেই ভুলে গেলাম বাবলী খুব সুন্দর রবীন্দ্রনাথের গান করতো। নিজে নিজে শিখেই করতো। আমরা মুগ্ধ হয়ে ওর গান শুনতাম।
অবশেষে আমরা বাবলীর বান্ধবীর বাড়ীতে পৌঁছালাম।দুই বান্ধবী দুজনকে পেয়ে মহা আনন্দে জড়িয়ে ধরলো। সব চাইতে বেশি খুশী হলো বান্ধবীর বড় ভাই।বাবলীর চোখে মুখে আনন্দের রোমান্টিক হাসি খেলে গেলো। বাবলীর সময় বেশ ভালো কাটতে লাগলো। বান্ধবী বার বার উঠে যাচ্ছিলো নানা কাজের বাহানায়। কিন্তু বান্ধবীর ভাই এক মুহুর্তের জন্যও উঠলো না।এক মিনিট সময়ও যেনো তার নষ্ট করার উপায় ছিলো না। ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক লাগছিলো না আমার। আমি ওর চাইতে এক ক্লাস উপরে পড়ি তারপরও বাবলীর কোন ভয় ডর নেই আমি যদি আম্মাকে বলি ঘটনাটা তার পরিনতি কি হবে। আমি বোকা বোকা হলেও ওদের প্রেমের ব্যাপারটা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলাম।কিন্তু বাসায় এসে কাউকে কিছু বললাম না কারন ওকে কোন বিপদে ফেলতে চাইনি। আমার এতোটা জীবনে আমি কখনো কাউকে বিপদে ফেলিনি বরং বিপদ থেকে উদ্ধার করেছি যদিও তার সিকৃতি কখনো পাইনি। ভাই বোনেরা কোন অন্যায় কিছু করলেও আমি কাউকে কিছু বলতাম না। আম্মা যদি ভাই বোনদের কোন কারনে শাসন করতো ওরা কাঁদলে আমিও ওদের সাথে কাঁদতে বসে যেতাম।
আমার বোকামীগুলো অসাধারণ ছিলো।
আম্মা একদিন আমাকে পানির জগে ছয় গ্লাস পানি ঢালতে বলেছিলেন কিন্তু পানিও জগটা কিছুটা ছোট ছিলো কিন্তু তাতে আমার কি? আম্মা আমাকে ছয় গ্লাস পানি ঢালতে বলছে আমাকে তাই করতে হবে পানি উপছে পড়ে টেবিল ভাসিয়ে দিয়েছিলাম। তবু্ও পানি ঢালা ধামাই নি।আমার জীবনে এমন বহু ঘটনা আমি ঘটিয়েছি তা বলতে থাকলে একটা উপন্যাস হয়ে যাবে। ভাই বোনেরা এক সাথে হলে আমার অসংখ্য বোকামীর গল্প নিয়ে এখনো হাসা হাসি করে। আর এসব গল্প শুনে লজ্জায় মরে যাই।
আমি শুধু বোকাই ছিলাম না অত্যান্ত ভীরু একজন মেয়ে ছিলাম।আমার ভিরুতার জন্য আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটাও আমি নিতে পারিনি। আমি কখনো কারো বিশ্বাস নষ্ট করি নি এবং কাউকে ঠকাবার চেষ্টা কখনো করিনি কিন্তু মানুষকে বিশ্বাস করে আমি ঠকেছি।জীবনে অনেক বন্ধু এসেছে যাদের প্রানের বন্ধু ভেবেছি ,সারা জীবন এ বন্ধুত্ব থাকবে ভেবে নিয়েছি। যাদেরকে আনন্দ দেবার জন্য প্রচুর শ্রম দিয়েছি। নিজেকে ক্লান্ত করেছি তাদের কাছ থেকেই আঘাত পেয়েছি সব চাইতে বেশী।কিন্তু সে আঘাতের প্রতিশোধ নেবার কথা কখনো ভাবনায় আসেনি। কিন্তু মানুষকে বিশ্বাস করতে আজকাল ভয় হয়।
তবে আমার অনেক ভালো বন্ধুও আছে আমার বিশ্বাস। তাদেরকে আমি অনেক ভালোবাসি।একটা কথা সত্যি ছাত্র জীবনের বন্ধুরা ছিলো শ্রেষ্ঠ। যাদের সাথে প্রান খুলে মনের সব কথা বলা যেতো। সেখানে ছিলো না কোন কুটিলতা ,জটিলতা। সে বন্ধুরা এখনো আমার প্রানের বন্ধু।
সময় অনেকটা পেরিয়ে গেছে,বয়েস বেড়েছে ,কারো প্রতি নেই আমার প্রতিশোধ নেবার কোন ইচ্ছে। প্রতিশোধ নেবার দায়িত্ব প্রকৃতির। যাকে আমরা ইংরেজিতে বলি Revenge of nature. আমি সবাইকে ভালোবেসে জীবন কাটিয়ে দিতে চাই।
ম্যাল্টন, অন্টারিও, কানাডা

