
কানাডার কর্মসংস্থান বিমা ব্যবস্থা ক্রমশই দেশের পরিবর্তিত শ্রমবাজারের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। পূর্ণকালীন ও স্থায়ী চাকরির বাইরে গিগ ওয়ার্ক, খণ্ডকালীন চাকরি এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থানের প্রসারের ফলে বিপুল সংখ্যক কর্মী প্রয়োজনের সময় সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এমনই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে ফুড ব্যাংকস কানাডার সর্বশেষ রিপোর্ট কার্ডে।
সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, কানাডার শ্রমবাজার গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। আগে যেখানে অধিকাংশ কর্মী একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্ণকালীন চাকরিতে নিয়োজিত থাকতেন, সেখানে এখন অনেকেই একাধিক খণ্ডকালীন কাজ, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কিংবা গিগ অর্থনীতির বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু কর্মসংস্থান বিমা ব্যবস্থা এখনও মূলত সেই পুরোনো শ্রমবাজারের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হচ্ছে।
ফুড ব্যাংকস কানাডার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কির্স্টিন বিয়ার্ডস্লে বলেছেন, বর্তমান বাস্তবতায় ইআই কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা কানাডার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “পুরোনো হয়ে যাওয়া কর্মসংস্থান বিমা ব্যবস্থা এমন এক সময়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে, যখন বেকারত্বের হার বাড়ছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অসংখ্য পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমস্যার মূল কারণ কর্মসংস্থান বিমার যোগ্যতা অর্জনের শর্ত। বর্তমানে ইআই সুবিধা পাওয়ার জন্য একজন কর্মীকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট সংখ্যক বিমাযোগ্য কর্মঘণ্টা পূরণ করতে হয়। কিন্তু আধুনিক শ্রমবাজারে অনেক কর্মীর কাজের সময় অনিয়মিত। কেউ একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, কেউ আবার স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে নিয়োজিত থাকেন। ফলে নিয়মিতভাবে কাজ করলেও প্রয়োজনীয় কর্মঘণ্টার শর্ত পূরণ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এই কাঠামো এমন একটি ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে যে একজন কর্মীর একটি মাত্র স্থায়ী চাকরি থাকবে। অথচ বাস্তবে এখন বহু মানুষ আয়ের জন্য একাধিক উৎসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে চাকরি হারানো বা কাজের সুযোগ কমে গেলে তারা আর্থিক ঝুঁকিতে পড়লেও সরকারি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডায় গিগ অর্থনীতির দ্রুত প্রসার ঘটেছে। খাবার সরবরাহ, রাইড-শেয়ারিং, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজসহ বিভিন্ন খাতে হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থান খুঁজে পেয়েছেন। তবে এই ধরনের চাকরির বড় একটি অংশ প্রচলিত কর্মসংস্থানের আওতায় পড়ে না। ফলে কর্মীরা নিয়মিত কর ও অন্যান্য খাতে অবদান রাখলেও চাকরি হারানোর পর কর্মসংস্থান বিমার সুবিধা পাওয়া তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফুড ব্যাংকস কানাডা বলছে, এর ফলে আয় অস্থিতিশীল এমন বিপুলসংখ্যক কর্মী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। অর্থনৈতিক মন্দা বা কর্মসংস্থানে ধাক্কা এলে তাদের অনেকেই খাদ্য সহায়তার মতো জরুরি সেবার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন।
কর্মসংস্থান বিমা কানাডার একটি ফেডারেল কর্মসূচি, যার লক্ষ্য চাকরি হারানোর পর বা দুই চাকরির মধ্যবর্তী সময়ে কর্মীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, একজন যোগ্য কর্মী তার সাপ্তাহিক বিমাযোগ্য আয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত সুবিধা পেতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, কারও বার্ষিক আয় যদি ৬৮ হাজার ৯০০ কানাডিয়ান ডলার হয়, তাহলে তিনি প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৭২৯ ডলার পর্যন্ত ইআই সুবিধা পেতে পারেন। তবে সমালোচকরা বলছেন, যাদের এই সহায়তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের বড় একটি অংশই কঠোর যোগ্যতার শর্তের কারণে এই কর্মসূচির বাইরে রয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর কানাডার কর্মসংস্থানমন্ত্রী প্যাটি হাইডু জানিয়েছেন, তার মন্ত্রণালয় ফুড ব্যাংকস কানাডার সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করছে। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, সরকার দেশের সামাজিক সুরক্ষা জাল আরও শক্তিশালী করার সম্ভাব্য উপায় নিয়ে কাজ করছে। পরিবর্তিত শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মসংস্থান বিমা ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও সরকার বিবেচনায় রাখছে।
এই প্রতিবেদন কেবল একটি সরকারি কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেনি; বরং কানাডার শ্রমবাজারে চলমান গভীর পরিবর্তনের দিকেও আলোকপাত করেছে। বর্তমানে কর্মসংস্থানের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। স্থায়ী চাকরির পরিবর্তে নমনীয় ও অস্থায়ী কর্মসংস্থান বাড়ছে। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো যদি সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তাহলে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আবাসন ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে কর্মসংস্থান বিমা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এখন কানাডার নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ফুড ব্যাংকস কানাডার মতে, বর্তমান ব্যবস্থার সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে আরও বেশি কর্মী সামাজিক সুরক্ষার বাইরে চলে যাবেন এবং খাদ্য সহায়তা ও অন্যান্য জরুরি সেবার ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকবে।

