
বৈদ্যুতিক যানবাহনের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিজনিত অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও ক্রমশ বাড়ছে। কানাডার টরন্টো শহরে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি অগ্নিকাণ্ড সেই আশঙ্কাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। হাই পার্ক এলাকার একটি শেডে ভয়াবহ আগুন লাগার ঘটনায় টরন্টো ফায়ার চিফ জিম জেসপ নতুন করে কঠোর নিরাপত্তা নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
বুধবার বিকেলে শহরের পশ্চিমাংশে রনসেসভ্যালিজ এভিনিউ এবং দি কুইন্সওয়ের সংলগ্ন একটি আবাসিক এলাকার লেনওয়ে শেডে আগুন লাগে। ঘটনাস্থলে পৌঁছে টরন্টো ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে আগুনে শেডে রাখা একাধিক ই-বাইক সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায়। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ফায়ার বিভাগের ধারণা, ই-বাইকের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। ঘটনাস্থলের বেশ কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেন টরন্টো ফায়ার চিফ জিম জেসপ। ছবিগুলোতে দেখা যায়, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ই-বাইকগুলো প্রায় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় জেসপ বলেন, “এই বিকালে শহরে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি থেকে আরও একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এবারের দুর্ঘটনাটি শেডে সংরক্ষিত ই-বাইকের কারণে ঘটেছে। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির নিরাপদ ব্যবহার ও সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা এবং এর ভয়াবহতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। তার মতে, এটি এখন শুধু সম্পত্তির ক্ষতির বিষয় নয়; বরং পুরো নগরজুড়ে জননিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ভেতরে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত থাকে। ব্যাটারিতে কোনো ধরনের ত্রুটি, অতিরিক্ত চার্জ, ক্ষতিগ্রস্ত সেল অথবা নিম্নমানের চার্জার ব্যবহারের ফলে ‘থার্মাল রানঅ্যাওয়ে’ নামক একটি প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এতে ব্যাটারি অত্যধিক উত্তপ্ত হয়ে বিস্ফোরণ বা আগুনের সৃষ্টি করে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধরনের আগুন সাধারণ অগ্নিকাণ্ডের তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিয়ন্ত্রণ করাও তুলনামূলকভাবে কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে আগুন নেভানোর পরও ব্যাটারি পুনরায় জ্বলে উঠতে পারে।
টরন্টো ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বুধবারের ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করেছে যে, ই-বাইক, ই-স্কুটার এবং অন্যান্য ব্যাটারিচালিত যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মকানুন প্রণয়ন জরুরি হয়ে উঠেছে। ফায়ার চিফ জেসপ দীর্ঘদিন ধরেই লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শক্তিশালী নীতিমালার পক্ষে সোচ্চার। তার মতে, বাজারে বিক্রি হওয়া ব্যাটারি ও চার্জিং সরঞ্জামের মান নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ সংরক্ষণব্যবস্থা এবং ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এই ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
পরিবেশবান্ধব পরিবহন হিসেবে ই-বাইকের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রযুক্তির এই অগ্রগতির সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সমানতালে উন্নত না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। হাই পার্কের সাম্প্রতিক ঘটনাটি সৌভাগ্যবশত প্রাণহানিতে রূপ নেয়নি। তবে এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির নিরাপত্তা এখন আর শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, জননিরাপত্তা এবং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

