
বিশ্বজুড়ে বহুল আলোচিত ডায়াবেটিসের ওষুধ ওজেম্পিকের প্রথম জেনেরিক সংস্করণ অনুমোদন করেছে কানাডার স্বাস্থ্য বিভাগ হেলথ কানাডা। এর মাধ্যমে জি৭ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কানাডাই প্রথম দেশ হিসেবে জেনেরিক সেমাগ্লুটাইড অনুমোদনের নজির গড়ল। স্বাস্থ্যনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু ডায়াবেটিস চিকিৎসার খরচ কমাবে না, বরং ওজন নিয়ন্ত্রণের চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন অনুমোদিত ইনজেকশনটি তৈরি করেছে ভারতের শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ড. রেড্ডি’স ল্যাবরেটোরিজ। এটি মূলত প্রাপ্তবয়স্ক টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের সাপ্তাহিক চিকিৎসার জন্য অনুমোদিত হয়েছে। ওষুধটির সক্রিয় উপাদান সেমাগ্লুটাইড, যা শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
গত কয়েক বছরে ওজেম্পিক শুধু ডায়াবেটিস চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি দ্রুত ওজন কমানোর একটি জনপ্রিয় ওষুধ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে ডায়াবেটিসের বাইরেও স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী ওষুধটির চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। তবে উচ্চমূল্যের কারণে বহু রোগীর নাগালের বাইরে ছিল এই চিকিৎসা। কানাডায় ব্র্যান্ড-নেম ওজেম্পিকের মাসিক খরচ কয়েকশ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যাদের স্বাস্থ্যবিমা নেই বা ওষুধের কভারেজ সীমিত, তাদের জন্য এই ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় জেনেরিক সংস্করণের অনুমোদনকে স্বাস্থ্যসেবায় “অ্যাক্সেসিবিলিটির বড় পদক্ষেপ” হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
হেলথ কানাডা জানিয়েছে, সাধারণত জেনেরিক ওষুধ ব্র্যান্ড-নেম ওষুধের তুলনায় ৪৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কম দামে পাওয়া যায়। তবে সেমাগ্লুটাইডের ক্ষেত্রে ঠিক কতটা মূল্য কমবে, তা নির্ভর করবে বাজারে কতগুলো জেনেরিক সংস্করণ আসে এবং প্রতিযোগিতা কতটা বাড়ে তার ওপর। ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর ফার্মাসিউটিক্যাল পলিসি বিশেষজ্ঞ মিনা টাড্রোস বলেছেন, প্রথম জেনেরিক অনুমোদনের পর দাম কিছুটা কমলেও প্রকৃত মূল্য হ্রাস শুরু হবে তখনই, যখন একাধিক কোম্পানি বাজারে প্রবেশ করবে।
প্যান-কানাডিয়ান ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যালায়েন্সের মূল্য কাঠামো অনুযায়ী : প্রথম জেনেরিক ওষুধের দাম ব্র্যান্ড-নেম ওষুধের ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। দ্বিতীয় জেনেরিক বাজারে এলে উভয়ের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নেমে আসতে পারে। তিনটি বা তার বেশি জেনেরিক সংস্করণ বাজারে থাকলে দাম ওজেম্পিকের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতা বাড়লে রোগীরা উল্লেখযোগ্য আর্থিক স্বস্তি পেতে পারেন।
হেলথ কানাডা জানিয়েছে, বর্তমানে আরও আটটি কোম্পানির জমা দেওয়া জেনেরিক সেমাগ্লুটাইড আবেদন পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। এগুলো অনুমোদন পেলে কানাডার বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে এবং ওষুধের দাম কমার সম্ভাবনাও জোরালো হবে। বিশ্লেষকদের মতে, ডায়াবেটিস ও স্থূলতা দুই ক্ষেত্রেই সেমাগ্লুটাইডের জনপ্রিয়তা এত বেশি যে আগামী কয়েক বছরে জেনেরিক বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে।
ভারত ইতোমধ্যেই বিশ্বে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। চলতি বছরের মার্চে ভারতের ড্রাগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ড. রেড্ডি’স ল্যাবোরেটরিজের তৈরি দুটি জেনেরিক সেমাগ্লুটাইড অনুমোদন দেয়। এর পেছনে বড় কারণ ছিল দেশটিতে নভো নরডিস্কের ওজেম্পিকের মেধাস্বত্বের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতের মতো বৃহৎ জেনেরিক উৎপাদনকারী দেশের অংশগ্রহণ বিশ্ববাজারে সেমাগ্লুটাইডের সরবরাহ বাড়াবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর রোগীদের জন্য চিকিৎসা সহজলভ্য করবে।
কানাডার এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ওষুধ বাজারে নতুন প্রতিযোগিতার দ্বার খুলে দিয়েছে। স্বাস্থ্যনীতি বিশ্লেষকদের মতে, যদি অন্যান্য দেশও একই পথে হাঁটে, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সেমাগ্লুটাইডভিত্তিক চিকিৎসা আরও সাশ্রয়ী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও স্থূলতা এই দুই দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত কোটি কোটি মানুষের জন্য এটি হতে পারে বড় স্বস্তির খবর।

