
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নেতৃত্বাধীন নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। প্রথমবারের মতো উপস্থাপিত স্প্রিং ইকোনমিক আপডেটে সরকার দক্ষ কর্মী প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আবাসন খাতকে ত্বরান্বিত করতে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে ফেডারেল ঘাটতি আগের পূর্বাভাসের তুলনায় কমে আসার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারি সংশোধিত আর্থিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে ফেডারেল ঘাটতি আগের হিসাবের তুলনায় ১ হাজার ১৪০ কোটি ডলার কম হয়েছে। এটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি উচ্চ সুদের হার, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার চাপ মোকাবিলা করছে।
স্প্রিং ইকোনমিক আপডেটে বলা হয়েছে, আগামী বছরগুলোতেও ঘাটতি ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। উদাহরণ হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঘাটতি ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৫৩০ কোটি ডলার। অথচ ২০২৫ সালের ফেডারেল বাজেটে একই সময়ের জন্য প্রাক্কলন ছিল ৬ হাজার ৫৪০ কোটি ডলার। অর্থাৎ, ব্যয় বাড়লেও রাজস্ব ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের উন্নতির ফলে সরকার ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি সরকারকে একদিকে সামাজিক ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে সহায়তা করবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে কানাডার আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতাও ধরে রাখবে।
“কানাডা স্ট্রং ফর অল” শিরোনামে প্রকাশিত ১৬৭ পৃষ্ঠার নথিতে সরকার কীভাবে প্রধানমন্ত্রী কার্নির উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চায়, তার বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। নথিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কার মধ্যে কানাডাকে আরও আত্মনির্ভরশীল ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে চায় সরকার।
সরকারের ভাষায়, “ভবিষ্যতের অর্থনীতি হবে দক্ষ মানবসম্পদ, সবুজ জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোকেন্দ্রিক।” আর সেই লক্ষ্য অর্জনেই নতুন ব্যয়ের বড় অংশ বরাদ্দ করা হয়েছে।
স্প্রিং ইকোনমিক আপডেটে নতুন করে ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার ব্যয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে গত ফেডারেল বাজেটের পর থেকে ঘোষিত অন্যান্য উদ্যোগ ও পরিকল্পনা যুক্ত করলে মোট নতুন ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৫ হাজার ৪৫০ কোটি ডলার। এই ব্যয়ের বড় অংশ যাবে : দক্ষ কর্মী প্রশিক্ষণ, নির্মাণ ও আবাসন খাত, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প ও জ্বালানি প্রকল্প, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে। সরকার মূলত দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিকে লক্ষ্য করে ব্যয় করছে। তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা অর্জনের বদলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজার শক্তিশালী করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইকোনমিক আপডেটের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হচ্ছে দেশজুড়ে নতুন নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ নতুন দক্ষ কর্মী তৈরি করা হবে। এই কর্মসূচির আওতায় নির্মাণ, বিদ্যুৎ, প্রকৌশল, সবুজ জ্বালানি, ভারী শিল্প এবং অবকাঠামো খাতের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি তরুণ, অভিবাসী এবং কর্মজীবন পরিবর্তনে আগ্রহীদেরও এই প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকার মনে করছে, কানাডায় বাড়তি আবাসন সংকট মোকাবিলা এবং বৃহৎ শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে নির্মাণ খাতে শ্রমিক সংকট অনেক প্রকল্পের গতি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে প্রশিক্ষিত কর্মী বাড়ানো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও জরুরি হয়ে উঠেছে।
লিবারেল সরকারের “টিম কানাডা স্ট্রং” পরিকল্পনার আওতায় আগামী পাঁচ বছরে ৫ হাজার ৯০০ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই তহবিলের মাধ্যমে জাতীয় উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৌশলগত শিল্প খাতকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়; বরং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে কানাডাকে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করার রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রচেষ্টা।
স্প্রিং ইকোনমিক আপডেট উত্থাপনের পর অর্থমন্ত্রী ফ্রাসোয়াঁ-ফিলিপ শ্যাম্পেইন হাউস অব কমন্সে বলেন, “কানাডা ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম। কানাডিয়ানরা সম্পদশালী মানুষ। আমরা সবাই মিলে অনিশ্চয়তার কুয়াশার মধ্যেও একটি নতুন পথ তৈরি করতে পারব।” তিনি আরও বলেন, বিশ্বের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে কানাডার প্রয়োজনীয় সম্পদ, দক্ষতা এবং সক্ষমতা রয়েছে। তাই এই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই স্প্রিং ইকোনমিক আপডেট প্রধানমন্ত্রী কার্নির সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর সরকার দেখাতে চাইছে যে তারা শুধু ব্যয় বাড়াচ্ছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থানের ভিত্তি তৈরি করছে। তবে সমালোচকদের একাংশের দাবি, এত বড় ব্যয় ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতি ও ঋণের চাপ বাড়াতে পারে। অন্যদিকে সমর্থকরা বলছেন, দক্ষ কর্মী ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ছাড়া ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়।
কানাডার এই নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দেশটির অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং আবাসন খাতে আগামী কয়েক বছরে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

