
কানাডার শিক্ষার্থী ভিসা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অনিয়ম ও তদারকির ঘাটতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিষয়টি সামনে আসার পর বাজেট ঘাটতির অজুহাতে তদন্ত সীমিত না করার অনুরোধ জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকদের অনেকেই। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. স্যামুয়েল হ্যানসেন এই প্রতিবেদককে বলেন, এই বিতর্ক সরকারকে আস্থাহীনতার সংকটে ফেলবে।
সম্প্রতি কানাডার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্সের অভিবাসন কমিটির সামনে হাজির হয়ে উপমন্ত্রী টেড গালিভান বলেন, শিক্ষার্থী ভিসার শর্ত ভঙ্গের ঘটনাগুলোকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখা উচিত, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো শুধুমাত্র নিয়মভঙ্গ নয়, বরং পরিকল্পিত জালিয়াতির ইঙ্গিত বহন করে।
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় কানাডার অডিটর জেনারেল কারেন হোগানের ২৩ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে। ওই প্রতিবেদনে ইমিগ্রেশন, রিফিউজিস অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডার শিক্ষার্থী ভিসা তদারকি ব্যবস্থায় গুরুতর দুর্বলতা উঠে আসে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের দেড় লাখেরও বেশি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী তাদের নির্ধারিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতই ছিলেন না যা তাদের ভিসা পাওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এত বিপুল সংখ্যক অনিয়মের পরও খুব সীমিত তদন্ত করা হয়েছে। বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজেট সংকটের কারণে মাত্র প্রায় ৪ হাজার ঘটনা তদন্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই তদন্তগুলোর মধ্যেও প্রায় ১ হাজার ৬০০টি মামলা অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য গত ছয় মাসে দুই দফা চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেননি।
উপমন্ত্রী গালিভান স্পষ্টভাবে বলেন, “আমরা আমাদের ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনায় প্রতিটি ঘটনার পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং প্রকৃত জালিয়াতির ইঙ্গিত রয়েছে। তাই এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।” তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, এই সংকট মোকাবিলায় ভবিষ্যতে বাজেটের ওপর কী প্রভাব পড়বে, সেটিও সরকারকে মূল্যায়ন করতে হবে।
এই ঘটনার মাধ্যমে কানাডার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা সামনে এসেছে। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী কানাডায় উচ্চশিক্ষার জন্য যান, যা দেশটির অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু যদি ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার হয় : তাহলে শিক্ষা খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, অবৈধ অভিবাসন বাড়তে পারে এবং এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। শুধু তদন্ত বাড়ানো নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা এবং ভিসা ইস্যুর পূর্ব যাচাই প্রক্রিয়াও আরও কঠোর করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থী ভিসা ব্যবস্থায় অনিয়মের এই চিত্র কানাডার অভিবাসন নীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বাজেট সংকট থাকলেও বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

