
লাভলু, মানে রাকিব হাসান আমার পাড়াতো ছোটভাই। মিরপুরে আমরা এক পাড়াতে থাকতাম। তখন তার মাথাতেও কবিতার পোকামাকড় বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। তাই কবিদের সান্নিধ্য চায়; আড্ডা দেয়। আমাদের পাড়াতেই থাকতেন কবি কাজী রোজী অথবা তাঁর পাড়াতেই আমরা থাকতাম। রোজী আপার বাসায় আমরা বিকেলে চা খেতাম, আড্ডা দিতাম, কবিতা নিয়ে আলোচনা করতাম।
হঠাৎ করে তরুণ কবি রাকীব হাসান সম্পাদক হবার অভিপ্রায়ে মেতে উঠালো। বের করবে লিটল ম্যাগ- আরব্ধ। দূরদর্শী রাকীব আমার ভেতরের ‘কাব্য প্রতিভা’ টের পেয়ে একগুচ্ছ নতুন ধারার কবিতা নিলো; শুধু কবিতাই নয়, প্রতিটা কবিতার প্রেক্ষাপট, বিষয়, ফুটনোট ইত্যাদি। সেই সাথে আমার সাক্ষাৎকার। বিশালাকারে বের করলো- আরব্ধ। আর আমাকে রাতারাতি খ্যাতিমান করে শামসুর রাহমানের কাছাকাছি পাঠিয়ে দিলো।
এদিকে ঠাকুর গাঁ থেকে ঢাকায় এসেছে এক ঝাঁক ঝলমলে তরুণী- আরজু, মেরী, মনি। এরা সবাই আমার ভক্ত। কিন্তু সেই তালিকা থেকে রাকীব আলাদা করে নিলো ছোটবোন অর্থাৎ মনি নামের কিশোরীটাকে! তাকে কানপড়া দিয়ে পটিয়ে পটিয়ে সাহিত্য শেখাতে লাগলো। নিজের সাহিত্যচর্চার বারোটা বাজিয়ে রাধাকৃষ্ণ হয়ে গেলো। সে তো এক ছোটগল্প। যে ছোটগল্প এখন বিশাল উপন্যাস।

তারা একদিন হংস মিথুনের মতো উড়াল দিয়ে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গেলো। পরে জানলান, রাকীব-মনিকা কেনিয়ায় ঢেরা গেঁথেছে। আরো জানলাম, কবি এখন ছবি আঁকে। বিখ্যাত হয়ে যাচ্ছে। ঘটনাটা ১৯৯২ সালের দিকে, তখন আমি আমার সম্পাদিত ‘সূচিপত্রে’ প্রবাসী লেখক সংখ্যায় রাকীবের (পাল্টা) সাক্ষাৎকার নিলাম। সে জানালো- কেনিয়ায় যাবার পর সেখানে রাষ্ট্রদূত ছিলো মেজর ডালিম। কোনো এক অনুষ্ঠানে রাকীব খুনি ডালিমের সাথে হাত মিলাতে অস্বীকার করে। বাহ, চমকে গেলাম। স্যালুট দিলাম!
রাকীব কেনিয়া ছাড়লো। চলে এলো কানাডায়, মন্ট্রিয়লে। জীবনের ঘূর্ণিচক্রে আমিও অভিবাসী হলাম রাকীবের পাশের শহরে- টরন্টোতে। আবার আমরা দূর দূরান্তের প্রাদেশিক পাড়াতো ভাই হয়ে গেলাম। আমার ভেতরে এক টুকরো রাকীব এবং আরেক টুকরো মানি বসবাস করে। আমি ওদের অনুভব করি- হ্রদয় দিয়ে। আমাদের মেয়ে মেয়ে, ওদেরও দুই মেয়ে- চারণ আর চিত্রণ। আমি এক হিসেবে চারণ-চিত্রণের মামা, আরেক হিসেবে চাচা। তাই চারণ-চিত্রণ আমাকে ‘মাচা’ ডাকে। [মনি মানে- নাহার মনিকা। আজ আর ওর কথা বললাম না। মনির কথা জমা থাকলো।]
বছরে একবার হলেও মন্ট্রিয়লে যাই। রাকীব-মনিদের কাছে। কাছের মানুষ, আপন জনের চেয়েও বেশি। সেন্ট লরেন্স নদীর সাথে জাড়ানো তাদের অপূর্ব বাড়িটা যায়। নান্দনিকতা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পরিপূর্ণ বাড়ির উঠোন জুড়ে নদীর পাড়। পাড়ে বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে মন্ত্র বা কবিতা পড়লেই ‘তৃষ্ণার্ত জলপরী’রা ছুটে আসে। রাকীব-মনির এই বাড়িটার নাম দিয়েছি- স্বর্গীয় দূতাবাস।
স্বর্গীয় দূতাবাসের দূত রাকীব।
টরন্টো, কানাডা

