
তখন আমি সবে তৃতীয় বর্ষ এম বি বি এসে উঠেছি প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষা পার হয়ে। এই পরীক্ষাটি মেডিকেলের সব থেকে কঠিন পরীক্ষা ছিলো সবার জন্য। অনেকের স্বপ্ন এখানে হোঁচট খায় সাময়িকের জন্য। রেজাল্টের পর বাড়ী থেকে ফেরার পথে ঢাকা থেকে একটি ষ্টেথোস্কোপ কিনে হোষ্টেলে এলাম। হাতে ষ্টেথো নিয়ে কলেজে যাবো। চোখে স্বপ্ন ডাক্তার হবো-ষ্টেথো হাতে নিজেকে ডাক্তার ডাক্তার লাগে।
প্রতিদিন সন্ধায় ষ্টেথো নিয়ে ওয়ার্ডে যাচ্ছি। একজন ক্লিনিক্যাল এসিসট্যান্ট আমাদেরকে হাতে কলমে পড়ান, শেখান কিভাবে রোগীর ফুস ফুসের শব্দ শুনতে হবে , হার্ট বিট শুনতে হবে। সে দিন আমরা অনেকেই ওয়ার্ডে। একমনে স্যারের কথা শুনছি। হঠাৎ পিছনে ফিরে দেখি কোন সময় মেঘ এসে চুপিসারে দাঁড়িয়েছে। মেঘ বরাবরই ছুটি শেষ হওয়ার সাথে সাথেই হোষ্টেলে আসে এবারই একটু দেরী করে আসলো।
ক্লাস শেষে মেঘকে বল্লাম
-কখোন এলে?
– সন্ধার ট্রেনে এসেই সোজা ওয়ার্ডে চলে এলাম।
আমাকে একটু টিপ্পনি কেটে বললো
-ওয়ার্ডে ক্লাস করছো। ইস মনে হয় অনেক শিখে ফেলেছো
আমি কোন কথা বললাম না। মেঘ সাধারনত আমার সাথে আগে কখনো এমন করে কথা বলেনি।
ওয়ার্ডের ক্লাস শেষ সবাই যে যার মতো হোষ্টেলে যেতে শুরু করেছে। মেঘ পিছন থেকে ডেকে বললো
-আমাকে একটু লেডিস হোষ্টেলে এগিয়ে দিয়ে এসোনা।
ছাত্রীরা সব ইতিমধ্যে চলে গেছে। মেঘের বোধ হয় একটু দেরী হয়েছে। এই অবস্থায় তাকে একা ছেড়ে দেয়া যায়না তাই সাথে নিয়ে হাটতে শুরু করলাম।
সেদিনের পর থেকে প্রতিদিন সন্ধায় মেঘ বায়না ধরে
-আমাকে একটু এগিয়ে দিয়ে এসোনা।
এক দিন বললাম
-অন্য মেয়েদের সাথে যেতে পারোনা?
-ওদের আমার ভালো লাগেনা।
মেঘের উত্তর শুনে আমি হতবাক।
প্রতিদিন এখন আমি মেঘের সঙ্গী হোষ্টেল পর্যন্ত যাওয়ার। অন্য সবার চোখ এড়ায়নি এটা তারা ফিস ফিস করা শুরু করে দিল যদিও আমার মাথা ব্যথা নেই।
সপ্তাহের ছুটির দিন সন্ধায় আমি লেডিস হোষ্টেলে যাই মেঘকে খবর পাঠাই সে আসে। দুজনা গল্প করি। মাঝে মাঝে আমি কিছু খাবার নিয়ে যাই দুজনা খাই, গল্প করি তারপর চলে আসি হোষ্টেলে। এক দিন শুভ আমাকে বললো
-দোস্ত তোর সাথে কথা আছে।
দাঁড়ালাম। শুভ আমার সহপাঠী ঘনিষ্ট বন্ধু।
-দোস্ত, শিহাব ভাই জানতে চেয়েছেন মেঘ এর সাথে তোর কি রিলেশন?
জানতাম এমন একটি বিষয়ের আর্বিভাব হবে। শিহাব ভাই সিনিয়র স্টুডেন্ট শুভ ঘনিষ্টজন। চিন্তা করছি কি বলবো। মেঘের সাথে তো আমার তেমন কোন সম্পর্ক গড়ে উঠেনি এখন পর্যন্ত।
-কোন রিলেশন নেই, শিহাব ভাইকে বলিস।
আমি বললাম শুভকে। শুভ চলে গেল।
সে সময় কলেজে কলেজ সংসদের নির্বাচনের কথা বার্তা শুনছি। অনেক দিন ছাত্র রাজনীতি বন্ধ ছিলো এখন অনুমতি মিলেছে ছাত্র রাজনীতির। শুভ একদিন রুমে এসে বললো
-দোস্ত ইলেকশনে দাড়াবি? তোর কথা ওরা আমাকে বলেছে।
কখনো ভাবিনি ডাক্তারী পড়তে এসে ছাত্র রাজনীতি করতে হবে। একবার, দুবার, তিনবার ভাবলাম। মনে হলো নিজের একটা আইডেন্টিটি দরকার। অনেক দূরের মানুষ আমি এখানে পড়তে এসেছি। সবাই নিজেরা এলাকা ভিত্তিক গ্রুপ তৈরী করে চলে আমরা কজন ছাড়া । অনেক দিন ধরে ফিল করছি। ক্লাসে মাঝে মাঝে বুলিং এর শিকারও হতে হয়।
শুভকে বললাম
-আমাকে নিয়ে চল।
পার্টির বড় ভাই আমাকে দেখে কি খুশী! জড়িয়ে ধরলেন। বললেন এ রকম ছেলে দরকার। আমি পর পর দুটি ফরমে সই করলাম। একটি রেজিষ্ট্রেশন আর অন্যটি নমিনেশন। কয়েকবার মেঘ এর কথা মনে পড়লো কিন্তু তখন সময় ছিলোনা মেঘের সাথে দেখা করার তাই তাকে না বলেই একাকী এই কাজ করলাম।
সে দিন সন্ধায় লেডিস হোষ্টেলে হাজির হলাম। মেঘকে দেখে মনে হলো আগেই সে খবর পেয়েছে তাই কোন রাখ ঢাক না করে বললাম
-তুমি শুনেছো বোধহয় যে আমি নমিনেশন নিয়েছি।
-হ্যা শুনেছি। তা তুমি আমাকে একটু জিজ্ঞাসা করতে পারতে?
-দুপুরে সময় পাইনি তাই এখন বলতে এলাম।
-এখন বলে কি করবে? কাজ তো করে ফেলেছো।
আমি কি উত্তর দেব? মেঘ আমাকে অনেকগুলো সমীকরণ বুঝালো ছাত্র রাজনীতির নিগেটিভ দিকগুলি উল্লেখ করে।
-ধরো হোষ্টেলে দুই দলে মারামারি করলো, তোমার দলের সাথে তুমি পালিয়ে গেলে। আমরাতো নিয়মিত ক্লাস করছি, ক্ষতি কার হলো?
এমন করেতো ভেবে দেখিনি। এই কথা আগে শুনলে আমি রাজনীতিতে নাম লেখাতাম না। মেঘের কথাগুলি অনুভব করতে লাগলাম। মনে পড়তে লাগলো বাবা-মা এর কথা। তারাতো আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।
-ঠিক আছে যা করেছো করেছো। তুমি কাল থেকে এখানে আর এসোনা এমন কি আমার সাথে আর যোগাযোগ করো না। আমিই তোমাকে ইলেকশনের বিষয়ে গোপনে সাহায্য করবো।
সে গোপনে আমাকে সাহায্য করতো। হাসপাতালের চার তলা ভবনের পেচানো সিড়ি দিয়ে একা নামছি হঠাৎ কোথা থেকে মেঘ এসে হাজির। ঝড়ের মতো দিক নির্দেশক কটি কথা বলে সে আবার উধাও।
ইলেকশনের দিন সকালে মেঘকে ক্যাম্পাসে দেখলাম না আগেই সে আমাকে বলেছিলো যে ইলেকশনের দিন সে ক্যাম্পাসে থাকবে না।
এর পর মেঘের সাথে আমার আর তেমন কথা হতো না আমিও আর চেষ্টা করতাম না।
সে দিন ইলেকশনে আমি বিপুল ভোটে পাশ করেছিলাম। জীবনের সব পরীক্ষায়ই আমি এভাবে পাশ করেছি শুধু একটি পরীক্ষা ছাড়া, তাহলে জীবন গল্প অন্যভাবে লেখা হতো।
ইয়েলোনাইফ, কানাডা

