
কানাডায় সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ স্কুলে গুলির ঘটনার পর দেশজুড়ে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে। নতুন এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কানাডিয়ান মনে করছেন এ ধরনের সহিংসতা ভবিষ্যতে তাদের নিজ নিজ কমিউনিটিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তার আবহ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে।
গত মাসে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের টাম্বলার রিজে অবস্থিত একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সংঘটিত গুলির ঘটনায় নয়জন নিহত হন। এই ঘটনার পরপরই জনমত যাচাই করতে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইউগভ একটি অনলাইন সমীক্ষা পরিচালনা করে। ১৯ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত ওই সমীক্ষায় অংশ নেন ৯৬৭ জন কানাডিয়ান নাগরিক।
সমীক্ষার ফলাফল ইঙ্গিত করছে, পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে দ্বিধা থাকলেও উদ্বেগের মাত্রা কম নয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ মনে করেন, তাদের নিজস্ব এলাকায় ভবিষ্যতে এ ধরনের গুলির ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ‘খুবই বেশি’ বা ‘মোটামুটি বেশি’। অন্যদিকে ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা এই আশঙ্কাকে ‘খুবই কম’ বা ‘প্রায় নেই’ বলে মনে করেছেন। অর্থাৎ সমাজে একটি বিভক্ত মানসিকতা তৈরি হয়েছে একদিকে আশঙ্কা, অন্যদিকে এখনও কিছুটা আস্থা।
তবে ঘটনার কারণ বিশ্লেষণে বেশিরভাগ উত্তরদাতা একমত। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৬৯ শতাংশ কানাডিয়ান বিশ্বাস করেন, এ ধরনের সহিংসতার পেছনে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাই প্রধান ভূমিকা পালন করছে। আধুনিক সমাজে মানসিক চাপ, একাকীত্ব এবং অপ্রকাশিত হতাশা কীভাবে চরম সহিংসতায় রূপ নিতে পারে এই ঘটনা যেন তারই নির্মম উদাহরণ।
এছাড়া ৫১ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। অস্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে বা যথাযথ নজরদারি না থাকলে, তা যে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে এই উপলব্ধিও সমীক্ষায় প্রতিফলিত হয়েছে।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে দায়ী করেছেন ২৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। তাদের মতে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সহিংস কনটেন্ট বা নেতিবাচক প্রভাব অনেক সময় মানসিকভাবে অস্থিতিশীল ব্যক্তিদের প্ররোচিত করতে পারে। একইসঙ্গে ২৩ শতাংশ উত্তরদাতা প্যারেন্টিং বা অভিভাবকত্বের ঘাটতিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে থাকা ব্যক্তি, জেসি রুটসেলার, ঘটনার দিন স্কুলে যাওয়ার আগে নিজের মা ও সৎ ভাইকে হত্যা করে। এরপর স্কুলে গিয়ে এক শিক্ষা সহায়কসহ পাঁচজন শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যা করে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে সে নিজের অস্ত্র নিজের দিকেই তাক করে যা পুরো ঘটনাটিকে আরও শোকাবহ করে তোলে।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের এপ্রিলের পর এটি কানাডায় একসঙ্গে এত মানুষের প্রাণহানির সবচেয়ে ভয়াবহ গুলির ঘটনা। ২০২০ সালে নোভা স্কশিয়ায় এক বন্দুকধারীর হামলায় ২২ জন নিহত হয়েছিলেন, যা দেশটির ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত। একইসঙ্গে ১৯৮৯ সালে মন্ট্রিয়লের ইকোল পলিটেকনিকে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পর এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ স্কুল-সংক্রান্ত গুলির ঘটনা, যেখানে ১৪ জন নারী প্রাণ হারিয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমীক্ষা কেবল জনমতের প্রতিফলন নয়, বরং একটি সতর্ক সংকেত। মানসিক স্বাস্থ্য সেবা জোরদার করা, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এই তিনটি ক্ষেত্রেই এখন জোর দেওয়া প্রয়োজন। না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
কানাডার মতো উন্নত ও নিরাপদ বলে পরিচিত দেশেও এমন ঘটনা যে ঘটতে পারে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয় এই সংকট মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকরা কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেন।

