
কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব কানাডা, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় সুদের হার নির্ধারণী সিদ্ধান্তের আগে এক জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সূচকের অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন সব মিলিয়ে মুদ্রানীতির ভারসাম্য রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক কর্মসংস্থান সংক্রান্ত উপাত্তে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে কানাডার অর্থনীতি প্রায় ৮৪ হাজার কর্মসংস্থান হারিয়েছে। এর ফলে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.৭ শতাংশে, যা গত কয়েক মাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। শ্রমবাজারে এই দুর্বলতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত, কারণ এটি ভোক্তা ব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে।
এর আগে স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা জানিয়েছিল, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে কানাডার অর্থনীতি বার্ষিক হিসাবে ০.৫ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। অর্থাৎ, প্রবৃদ্ধির গতি ইতিমধ্যেই কমতে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে সুদের হার বাড়ানো হলে অর্থনীতিতে আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে, আবার হার কমালে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে এক ধরনের দ্বৈত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ডগ পর্টার-এর মতে, ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার কমে ১.৮ শতাংশে নামতে পারে, যা জানুয়ারির তুলনায় ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট কম। তবে এই পতনের পেছনে বড় কারণ হলো গত বছরের কর ছাড়ের প্রভাব, যা সাময়িক। কিন্তু এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা নতুন করে মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিতে পারে।
সম্প্রতি পারস্য উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা এবং হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে যেকোনো বিঘ্ন সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও দামে প্রভাব ফেলে। এর প্রভাব ইতিমধ্যেই কানাডার অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়তে শুরু করেছে। পাম্পে জ্বালানির দাম বাড়ছে, যা আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে।
বর্তমানে ব্যাংক অব কানাডার নীতিনির্ধারণী সুদের হার ২.২৫ শতাংশে স্থির রয়েছে, যা জানুয়ারিতে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। তবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে মূল প্রশ্ন – তারা কি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাঁচাতে সুদের হার কমাবে? নাকি সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় হার বাড়াবে বা অপরিবর্তিত রাখবে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্ত সহজ হবে না। কারণ একদিকে দুর্বল শ্রমবাজার ও সংকুচিত প্রবৃদ্ধি, অন্যদিকে জ্বালানি দামের কারণে সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতি এই দুই বিপরীতমুখী শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের এই পর্যায়ে ব্যাংক অব কানাডার জন্য মুদ্রানীতি নির্ধারণ এক কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা সবকিছু বিবেচনায় রেখে তাদের এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ঝুঁকিও কমাবে।
এই প্রেক্ষাপটে আগামী সুদের হার ঘোষণা শুধু কানাডার জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

