
অন্টারিও প্রদেশের ছোট গ্রামীণ কমিউনিটি ক্লিয়ারভিউয়ে গত এক বছরে নীরবে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তা এখন স্পষ্ট রূপ নিচ্ছে। প্রায় ১৫ হাজার মানুষের বসতি এই শহরটির অবস্থান ব্যারি থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে। সম্প্রতি জানা গেছে, এখানেই স্থাপন করা হতে পারে কানাডার নতুন ‘ওভার-দ্য-হরাইজন’ সামরিক রাডার প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ক্লিয়ারভিউয়ের মেয়র ডগ মেজারস প্রথম সন্দেহের সূত্র পান প্রায় এক বছর আগে। তিনি লক্ষ্য করেন, একটি স্থানীয় খামার নতুন করে নিবন্ধিত হয়েছে। কিছুদিন পর সেটি আবার বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত হয়। বিষয়টি তখনো স্বাভাবিক লেনদেন বলেই মনে হয়েছিল।
কিন্তু কয়েক মাস পর ফেডারেল সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে মেজারস জানতে পারেন, অটোয়ার উচ্চাভিলাষী সামরিক রাডার প্রকল্পের জন্য ক্লিয়ারভিউকে বেছে নেওয়া হয়েছে। বৈঠকের মাত্র তিন দিন পরই কিছু খামারি ও জমির মালিক জাতীয় প্রতিরক্ষা বিভাগ থেকে চিঠি পান। সেখানে জানতে চাওয়া হয় তারা তাদের জমি বিক্রি করতে আগ্রহী কি না। মেয়র মেজারসের ভাষায়, “এমন কিছু যে ঘটছে, সে সম্পর্কে আমাদের কোনো পূর্বধারণা ছিল না। পুরো বিষয়টি আমাদের জন্য বিস্ময়কর এবং হতাশাজনক।”
প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের এই রাডার সিস্টেম স্থাপন করা হচ্ছে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত থেকে আর্কটিক অঞ্চলের আকাশসীমা পর্যন্ত নজরদারি জোরদার করার উদ্দেশ্যে। এটি কানাডার বৃহত্তর প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির অংশ, যার মাধ্যমে আগামী দুই দশকে নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড বা নোরাডকে শক্তিশালী করতে ৩ হাজার ৮৬০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ওভার-দ্য-হরাইজন রাডার প্রযুক্তি প্রচলিত রাডারের তুলনায় অনেক দূরের লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম। পৃথিবীর বক্রতা অতিক্রম করে রেডিও তরঙ্গ প্রেরণের মাধ্যমে এটি দূরবর্তী আকাশসীমায় সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও আর্কটিক অঞ্চলে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের প্রযুক্তি এখন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্লিয়ারভিউয়ে একটি রাডার ‘রিসিভিং সাইট’ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ট্রান্সমিটিং স্টেশন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে কাওয়ার্থা লেক এবং পিটারবোরোর উত্তর-পশ্চিমাংশ। এসব স্থানে বৃহৎ অ্যান্টেনা স্থাপন করা হবে, যেগুলোর কোনো কোনোটি ৪৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে।
এত বড় অবকাঠামো স্থাপনের ফলে স্থানীয় কৃষিজমি, পরিবেশ ও বসবাসযোগ্যতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে এমন আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা। অনেকের মতে, কৃষিনির্ভর ও শান্ত গ্রামীণ এলাকার চরিত্র বদলে যেতে পারে।
প্রকল্পের ঘোষণার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতা দেখা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণকে পর্যাপ্তভাবে অবহিত করা হয়নি। এতে স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কিছু জমির মালিক বিক্রির প্রস্তাব বিবেচনা করলেও অনেকে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের আশঙ্কা, জমি বিক্রির মাধ্যমে কেবল ব্যক্তিগত সম্পত্তিই নয়, বরং কমিউনিটির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্প কানাডার জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা, উন্নত হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির বিকাশ এসব বিবেচনায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে নেওয়া সিদ্ধান্ত স্থানীয় জনগণের মতামত ও স্বার্থকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে? ক্লিয়ারভিউয়ের ঘটনাটি সেই ভারসাম্যের জটিলতাকেই সামনে এনেছে।
ফেডারেল সরকার এখনো প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সময়সূচি প্রকাশ করেনি। তবে জমি অধিগ্রহণ ও প্রাথমিক অবকাঠামো প্রস্তুতির ইঙ্গিত স্পষ্ট। স্থানীয় প্রশাসন আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে চাইলেও বিরোধিতা অব্যাহত রয়েছে।
ক্লিয়ারভিউয়ের শান্ত গ্রামীণ প্রান্তর এখন জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলের কেন্দ্রে। এই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হলে, এটি শুধু কানাডার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই নয়, বরং ছোট একটি কমিউনিটির সামাজিক-অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকেও নতুন মোড়ে নিয়ে যাবে।

