
নীমতলার বাসস্টপ আজও টিকে আছে। শুধু উঠে গেছে মামা চা।
মামা চায়ের বদলে সেখানে মিট কর্ণার নামে নতুন আড্ডাখানা উঠেছে। যাদের আসার কথা তারা এসেই কর্ণার খুঁজে। কার আগে কে বসবে সেটা নিয়েও একটা সিনেমা তৈরি হয়ে যায়। মিট কর্ণারে চয়ের সাথে কফিও বিক্রি হয়। আমাদের সময়কার এক টাকার বদলে দশ টাকা নেয় তবুও যদি লিকার হতো কড়া।
দোকানের পেছনের দেওয়ালটা ভেঙ্গে যাচ্ছে। বলতে পারো নব্বই ভাগই ভেঙ্গে গেছে। একদিন ওই ইট সিমেন্টের বুকে পা তুলে আমরা বিশ্ব জয় করতাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে লিখে আসতাম আজ বুধবার অথবা বৃহস্পতি।
যথেষ্ট ছিল সপ্তাহের সেই দুটো দিন। আজকাল কেউ দেওয়ালে পা ঠেকিয়ে চিনাবাদাম খায় না। এখন প্রেমের তৃতীয় পক্ষ হলো বার্গার কিংবা ফ্রাইস। আমিষভোজন আর তেল চড়চড়ি! প্রেমের সবটুকুই এখন পাকস্থলী। ওসব খেতে সমানে দুহাত ব্যবহার করতে হয়। তাহলে বল, প্রেম কোথায়? মানুষের কি তিনটে হাত থাকে!
মামা চায়ের দোকানের দেওয়ালে এক পা ঠেকিয়ে তুমি যখন দাড়িয়ে থাকতে, পাঁচ ইঞ্চি উপড়ে ওঠা তোমার শাড়ী আমার সাথে রাজনীতি করতো। তোমার অন্য পায়ে ছিল শতভাগ স্বাধীনতা। ইচ্ছে হলে হেঁটে চলে যাওয়া তেমন নির্ভরতা।
না, এক পা না। শেষ বৃহস্পতিতে তুমি দু’পায়ের জোর দেখিয়েছিলে। ওভাবে শুষ্ক চোখে তোমার হুট হাট চলে যাবার পর আমি আর মামা চায়ের দেওয়াল অনেকক্ষণ একাকীত্বে ডুবে ছিলাম।
একসময় দেওয়ালটা আমাকে বুকে তুলে নিলো। আমিও তাকে। আমাদের মধ্যে থেকে কে যেন বলেছিল কাঁদিস নে। সাথে এও বলেছিলাম, যেমন খুশি চলে যাওয়া – ওটাও স্বাধীনতা।
আমার মধ্যে এখনো আমি গেঁথে আছি। নিজের জন্য নিজেই নিচ্ছিদ্র প্রহরী। কারোর প্রবেশ নেই এই দেহে, মনে এবং যেসব যায়গা তুমি কিনে নিয়েছিলে।
বল কেমন আছ?
এই চিঠিটি যে নিয়ে যাচ্ছে তাকে আমরা এক সময় পিচ্চি ডাকতাম। এখন ওর নিজেরই নয় বছরের একটা ছেলে আছে। বউটা আবার পোয়াতি হয়েছে। আশা করছে এবারও যেন পুত্র সন্তান হয়। আমি দোয়া করছি যেন মেয়ে হয়।
হা হা মনে পড়ে গেল আমরাও ছেলে না মেয়ে, ছেলে না মেয় এই নিয়ে তর্ক করতাম।
দশ ভাগ অবশিষ্ট দেওয়ালে এখনো যথেষ্ট যায়গা খালি। অনায়াসে দু’জোড়া পা সে সামাল দিতে পারবে। যদি মন কাঁদে, যদি সেই তীর্থ দেওয়ালখানা কখনো দেখতে ইচ্ছে করে। যদি তেমন কিছু নাও হয় তবুও কিছুক্ষণের জন্য এসে সম্পূর্ণের দশভাগকে একবার দেখে যেও। মনে কর দেয়ালটা কেমোথেরাপি নিয়ে বেঁচে আছে। ইটপাথরের হৃদয় যদি আমরা বুঝতে না পারি তাহলে মানুষ হয়ে কী লাভ? এক সময় কত পাহারা দিয়েছে সে আমাকে। তোমাকেও। তুমি কখন আসবে। আমি কখন থেকে দাঁড়িয়ে থাকতাম সেইতো একমাত্র সাক্ষী ওসবের।
তোমার মনে আছে ফুটফুটে একটা মেয়ে ফুল বিক্রি করতো। তুমি মাঝে মাঝে ওর কাছ থেকে বকুল ফুলের মালা কিনতে। একবার বলেছিলে এর সাথে পিচ্চির মানাবে ভাল। সেই মেয়েটিকেই পিচ্চি বিয়ে করেছে।
আজ অনেক লিখন দেওয়ালের গায়ে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। শিবিরের শ্লোগান। নাড়ায়ে তকবির। কোন যুবতীর জন্য লিখে রাখা যুবকের ফোন নম্বর। তবুও তুমি যদি এসে শুধু এইটুকু লিখে দিতে পারো
‘কাল কেন আসো নি’।
সেদিন থেকে সব দোষ আমার হয়ে যাবে।

