
ইসরায়েল–হামাস যুদ্ধের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত মতামতকে কেন্দ্র করে কানাডার বিভিন্ন পেশার অন্তত তিনজন কর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল একজন প্যারামেডিক বরখাস্ত হয়েছিলেন, একজন শিক্ষককে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল, আর একজন চিকিৎসকের রেসিডেন্সি বাতিল করা হয়। তাদের অভিযোগ, ইসরায়েলবিরোধী মন্তব্য করায় তাঁদের কাজ চলে গেছে এবং এসব পদক্ষেপ ছিল অন্যায় ও কানাডার চার্টার অব রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমসে প্রদত্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে কানাডায় বাকস্বাধীনতা ও কর্মস্থলের নীতিমালা দুইয়ের ভারসাম্য নিয়ে তীব্র বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ইয়র্ক রিজিয়নের প্যারামেডিক ক্যাথেরিন জারসজ্যাক জানান, তাঁর ইউনিয়নের ফেসবুক পেজে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়ে মন্তব্য করার পর তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। তাঁর মতে, “একটি মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বা বিক্ষোভের আহ্বান জানানো অপরাধ হতে পারে না। কিন্তু গত দুই বছরে যেভাবে মানুষকে চাকরি হারাতে হয়েছে, তা প্রমাণ করে আমাদের বাস্তবে সেই স্বাধীনতা নেই।” তিনি আরও বলেন, তাঁর মন্তব্য ছিল একটি রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা; কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী, বিশেষত ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে নয়।
শিক্ষক ও চিকিৎসকের ক্ষেত্রেও অভিযোগ একই ইসরায়েলের সামরিক নীতি বা গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনামূলক মন্তব্য পোস্ট করার পর তাঁদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়।
টরন্টো মেট্রোপলিটান ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন–এর পরিচালক জেমস এল. টার্ক বলেন, “ইসরায়েলকে ঘিরে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে যে প্রতিরোধ দেখা যায়, তা আগের মতোই শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এখানে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত আমি দেখছি না।”
তাঁর মতে, কর্মীরা যখন তাদের ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করেন বিশেষত রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সেটি কতটুকু কর্মস্থলের নীতিমালা ভঙ্গ বলে বিবেচিত হবে, তার নির্দিষ্ট কোনো সার্বজনীন মানদণ্ড নেই। এই অস্পষ্টতাই ভয় ও আত্মসংযম তৈরি করছে। বাক স্বাধীনতার পক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, কর্মস্থলের বাইরের মন্তব্যের কারণে কাউকে বরখাস্ত করা বা কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া চার্টারপ্রদত্ত অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইসরায়েলপন্থী সংগঠনগুলো এবং ইহুদিবিদ্বেষ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর দাবি সম্পূর্ণ আলাদা। তারা বলছে চাকরিজীবীদের অনলাইন আচরণও তাঁদের কর্মস্থলের সুনামকে প্রভাবিত করতে পারে। কোনো মন্তব্য যদি ঘৃণা ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে বা প্রতিষ্ঠানিক নীতির বিপরীতে যায়, তাহলে নিয়োগদাতার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার আছে। ইসরায়েলকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করার অনেক পোস্টই ইহুদিবিদ্বেষের সাথে মিলেমিশে যায় যা কর্মস্থলের জন্য হুমকি বলে বিবেচিত হতে পারে। এই যুক্তিগুলোই তিনজন কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থার পেছনে প্রধান ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসরায়েল নিয়ে মতামত প্রকাশে ভিন্নমতের মধ্যে ভয় ও দ্বিধা রয়ে গেছে। বাকস্বাধীনতার পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের মতে, এই সংঘাতকে কেন্দ্র করে একটি “ডিজিটাল নজরদারি সংস্কৃতি” তৈরি হয়েছে যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়; এতে প্রায় ১,২০০ ইসরায়েলি নিহত এবং ২৫০ জনের বেশি জিম্মি হন। এর পর ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ইসরায়েলের হামলায় ৬৯ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন যা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
কানাডায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা আইনি কাঠামোর মধ্যে সুরক্ষিত হলেও বাস্তবে কর্মস্থলের নীতি, রাজনৈতিক চাপ এবং অনলাইন আচরণের পর্যালোচনা সব মিলিয়ে একটি জটিল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করা কি কর্মস্থলের শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে?
এ প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট নয়। কিন্তু ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, ইসরায়েল–হামাস সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যকেই নয় পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলোর বাকস্বাধীনতা সংস্কৃতিকেও গভীরভাবে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে।

