
বিশ্বব্যাপী পানীয়, চকোলেট, শিশু খাদ্য ও পোষা প্রাণীর খাদ্যের মতো জনপ্রিয় পণ্য উৎপাদনকারী সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি নেসলে তাদের কর্মীসংখ্যায় বড় ধরনের পুনর্গঠন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, আগামী দুই বছরে মোট ১৬ হাজার কর্মী ছাঁটাই করা হবে যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে কোনো বড় খাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বৃহৎ কর্মী ছাঁটাই উদ্যোগ।
নেসলে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানায়, কোম্পানিটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার চাপ মোকাবিলা করতে এবং তাদের আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করতে ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্য বাড়িয়েছে। প্রাথমিকভাবে যেখানে ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্য ছিল ২৫০ কোটি ডলার, সেখানে তা বাড়িয়ে ৩৭৬ কোটি ডলার করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই ব্যয় সাশ্রয়ের বড় অংশ আসবে কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে যথা – ১২ হাজার হোয়াইট-কলার (অফিসভিত্তিক) কর্মী, এবং ৪ হাজার প্রোডাকশন ও সাপ্লাই চেইন কর্মী, যা নেসলের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মী কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনবে। নেসলের হিসেবে, শুধুমাত্র অফিসভিত্তিক কর্মী ছাঁটাই থেকেই আগামী বছরের শেষ নাগাদ ১২৫ কোটি ডলার ব্যয় সাশ্রয় হবে।
২০২৪ সাল নেসলের জন্য অস্থিরতার বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কর্মী ছাঁটাই ঘোষণার আগেই প্রতিষ্ঠানটি নেতৃত্ব সংকটে পড়ে। কোম্পানির সিইও লরেন্ট ফ্রেইক্স–এর এক কর্মীর সঙ্গে গোপন সম্পর্কের বিষয় প্রকাশ্যে এলে তদন্তের পর তাকে গত মাসে বরখাস্ত করা হয়। দায়িত্ব পালন করেছিলেন মাত্র এক বছর। তার স্থলে নিয়োগ পেয়েছেন নেসলের দীর্ঘদিনের নির্বাহী ফিলিপ নাভরাতিল।
এদিকে, সিইওকে বরখাস্তের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পদত্যাগ করেন কোম্পানির চেয়ারম্যান পল বাল্কে। এতে নেসলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা কোম্পানির সামগ্রিক দিকনির্দেশনায় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা।
খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারক অন্যান্য বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কঠিন প্রতিযোগিতার পাশাপাশি নেসলেকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যেমন – বৈশ্বিক বাজারে কফি ও কোকোয়ার মূল্যের উল্লম্ফন, বিভিন্ন দেশে উৎপাদনব্যয় বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নতুন শুল্ক নীতি। এই বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে গ্রীষ্মে নেসলে তাদের পণ্যের মূল্য বাড়াতে বাধ্য হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সম্প্রতি ব্রাজিলীয় কফি ও কমলার জুসসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করেছে। সর্বশেষ আরোপিত শুল্ক ৫০%, যা আগের ৪০% শুল্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মোট ৯০% পর্যন্ত বেড়ে গেছে এবং এর বাইরে আগে থেকেই ছিল ১০% অতিরিক্ত শুল্ক। কফি ও কোকোয়ার সরবরাহ শৃঙ্খলে এ ধরনের শুল্ক নেসলের মতো বৈশ্বিক কফি-বাণিজ্যনির্ভর কোম্পানির ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।
নেসলের এ সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক চাকরি বাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কোম্পানির বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার কর্মী কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় পড়বে। উৎপাদন ইউনিটগুলোতে পুনর্গঠন ও অটোমেশন প্রক্রিয়া জোরদার হতে পারে। করপোরেট দপ্তরগুলোতে দক্ষতা পুনর্বিন্যাসের প্রবণতা বাড়বে।
তবে নেসলে জানিয়েছে, তারা দীর্ঘমেয়াদে “উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং পুনর্বিন্যাসকৃত ব্যবসায়িক কৌশলের” ওপর জোর দিচ্ছে।

