টরন্টো হাসপাতালের জরুরি কক্ষের চাপ কমাচ্ছে হাউজিং মডেল

টরন্টো হাসপাতালের জরুরি কক্ষের চাপ কমাচ্ছে হাউজিং মডেল - the Bengali Times
টরন্টো শহরে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সংকট দেখা যাচ্ছে গৃহহীন মাদকাসক্ত এবং মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষদের বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া

টরন্টো শহরে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সংকট দেখা যাচ্ছে গৃহহীন, মাদকাসক্ত এবং মানসিক স্বাস্থ্য–ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া। চিকিৎসা ভাষায় যাদের বলা হয় “ফ্রিকোয়েন্ট ফ্লায়ার্স”, তারা প্রত্যেকেই বছরের পর বছর জরুরি বিভাগে শত শতবার হাজির হন। এই চক্র থেকে বেরোবার কোনো পথ থাকে না: রাস্তায় জীবন, অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া, হাসপাতালে থাকা তারপর আবার রাস্তায় ফেরা।

এই চক্র ভাঙার সবচেয়ে বাস্তব উদাহরণ টরন্টোর ৪৪ বছর বয়সী জেসন মাইলস।

- Advertisement -

জেসন মাইলসের নাম টরন্টোর অপরাধ তালিকায় অপরিচিত নয়। বারবার জেল, বারবার রাস্তায় ফেরা প্রতিবারই আরও শক্ত ও আরও নিষ্ঠুর হয়ে উঠতেন। জেলে নিয়মিত ভারোত্তলন, বাইরে এসে যোগাযোগ বিস্তার সব মিলিয়ে আরও বড় অপরাধের দিকে তার ঝোঁক ছিল স্পষ্ট।

তিনি নিজেই স্বীকার করেন, তার অতীত ভরপুর মারামারি, ছুরিকাঘাত ও গাড়ি চুরির মতো অপরাধে। বহু বছর তিনি ফেন্টানাইলে আসক্ত ছিলেন এবং প্রায় পুরো এক দশক কাটিয়েছেন রাস্তায়।

অদ্ভুতভাবে, এত অপরাধমূলক ইতিহাস থাকার পরও তিনি পুলিশ, নার্স বা চিকিৎসকের সঙ্গে খুব কমই যোগাযোগে এসেছেন। রাস্তায় না থাকলে তিনি প্রায়ই হাসপাতালে ভর্তি থাকতেন। জরুরি বিভাগেই তার সময় কাটত সবচেয়ে বেশি।

টরন্টোর ইউনিভার্সিটি হেলথ নেটওয়ার্কের (UHN) ডা. অ্যান্ড্রু বুজারি ও তার দল গবেষণায় দেখেছেন, মাত্র ১০০ জন রোগী এক বছরে প্রায় ৪,৫০০ বার জরুরি বিভাগে এসেছেন। এই মানুষেরা যখন হাসপাতালে এক মাস থাকেন, তখন সরকারি খরচ দাঁড়ায় ৬০ হাজার ডলারের বেশি। তুলনায় জেলখানায় একজনকে রাখার খরচ: প্রায় ১৫ হাজার ডলার এবং আশ্রয়কেন্দ্রে রাখলে খরচ: মাত্র ৬ হাজার ডলার

এর মানে, গৃহহীনতা, আসক্তি ও স্বাস্থ্য সমস্যা সবকিছু মিলে সরকারকে হাসপাতালে বারবার ভর্তির তুলনায় বহু গুণ বেশি ব্যয়বহুল করে তুলছে।

সমস্যাটিকে ভিন্নভাবে দেখলেন ডা. বুজারি। হাসপাতাল নেটওয়ার্কের সিইও কিথ হানব্লের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করলেন অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ফ্রেড ভিক্টর–এর। লক্ষ্য ছিল গৃহহীন, অসুস্থ, আসক্ত ব্যক্তিদের হাসপাতাল বা জেল নয়, একটি স্থিতিশীল বাড়ির ব্যবস্থা দেওয়া।

ফলাফল UHN–এর মালিকানাধীন জমিতে চারতলা একটি নতুন ভবন নির্মাণ, নাম ডান হাউস। এখানে রয়েছে  ৫১টি দীর্ঘমেয়াদি ভাড়া–ইউনিট, ডাক্তার, নার্স, সামাজিক কর্মী, পুনর্বাসন সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এক ছাদের নিচে।

এটি কেবল আবাসন নয় একটি সম্পূর্ণ পুনর্বাসন ও পুনর্বিবেচনার পরিবেশ।

এক বছর আগে পার্কডেল নেবারহুড থেকে যারা এসেছেন, তাদের মধ্যে আছেন জেসন মাইলসও। তিনি বলেন, “মনে হয়েছে যেন আমি লটারি জিতেছি। এটা একটা উপহার। এই উপকারের ঋণ কখনো শোধ করতে পারব বলে মনে হয় না।”

২২ মাস ধরে তিনি সুস্থ ও সঠিক পথে আছেন। তার বহু শারীরিক সমস্যা কমে গেছে, কিছু পুরোপুরি সেরে উঠেছে। সবচেয়ে বড় কথা তিনি এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে পারছেন। “আমি এখন অনেক ভালো জায়গায় আছি। সামনে কী করব তা এখন আমি কল্পনা করতে পারছি।”

ফেডারেল সরকারের র‍্যাপিড হাউজিং ইনিশিয়েটিভ–এর অংশ হিসেবে, সিটি অব টরন্টোর সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে এই মডুলার বিল্ডিং তৈরি হয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে গৃহহীন মানুষকে বাড়ি দিলে, তাদের জীবন বদলায়। আর তাতে সরকারের ব্যয় কমে, অপরাধ কমে, সমাজের চাপও কমে।

জেসন মাইলসের গল্প কেবল একজন মানুষের জীবনযুদ্ধ নয়; এটি দেখিয়ে দেয় সমাজ সবচেয়ে উপেক্ষিত মানুষগুলোকেও যদি নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা দেয়, তারা নিজেরাই বাকি পথ পাড়ি দিতে পারে।

ডান হাউস টরন্টোতে ভবিষ্যৎ সমাজকল্যাণের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করছে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles