
টরন্টোর গণপরিবহন ব্যবস্থায় যাত্রীদের জন্য তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর এক গবেষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী অ্যান্ড্রু ইলারসিচ সম্প্রতি চালু করেছেন একটি অনন্য ওয়েবসাইট, যা ট্রানজিট যাত্রীদেরকে এক জায়গায় দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য জানার সুযোগ করে দিয়েছে।
ওয়েবসাইটটির নাম টিটিসিম্যাপডটসিএ, যা বর্তমানে টরন্টো ট্রানজিট কমিশনের (টিটিসি) সাবওয়ে পরিষেবার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ইলারসিচের লক্ষ্য হলো এমন একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে যাত্রীরা এক নজরে জানতে পারবেন কোন লাইনে দেরি হচ্ছে, কোন স্টেশনের এলিভেটর নষ্ট, কিংবা কোথায় পরিষেবা আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে।
অ্যান্ড্রু ইলারসিচ বলেন, “টিটিসির নিজস্ব ওয়েবসাইটে সব তথ্যই আছে, তবে সেগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে বিভিন্ন পাতায়। যাত্রীদের সাধারণত এসব তথ্য পেতে অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। কোনো যাত্রী যদি জানতে চান কোন স্টেশনের এলিভেটর কাজ করছে না বা কোন লাইনে বিলম্ব, তাহলে টিটিসির ওয়েবসাইটে ঘুরে বেড়াতে হয় অন্তত দশ থেকে বিশ মিনিট।”
তিনি আরও বলেন, “আমি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চেয়েছি, যা ভোরে কর্মস্থলে যাওয়ার আগে বা পড়াশোনায় বের হওয়ার সময় যাত্রীদের জন্য এক মিনিটেই প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করবে। এতে সময় বাঁচবে, এবং যাত্রীরা নিজেদের রুট পরিকল্পনা আগেই ঠিক করতে পারবেন।”
ওয়েবসাইটটিতে সাবওয়ে লাইনের প্রতিটি স্টেশনকে ইন্টারেকটিভ ম্যাপ আকারে দেখানো হয়েছে। কোন স্টেশন সচল, কোথায় প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলছে—সব তথ্য সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে হালনাগাদ হয়। যদিও বর্তমানে ওয়েবসাইটটি শুধু সাবওয়ে সিস্টেমের তথ্য দিচ্ছে, ইলারসিচ জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে তিনি বাস ও স্ট্রিটকার পরিষেবাগুলোকেও এর আওতায় আনবেন।
ইলারসিচ জানান, ওয়েবসাইটটি তৈরির কাজ সহজ ছিল না। কারণ, টিটিসির ওয়েবসাইটে থাকা তথ্যগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয় এবং বিভিন্ন উৎসে ছড়িয়ে থাকে। তিনি বলেন, “সব তথ্য সংগ্রহ করে তা এক প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করতে অনেক সময় লেগেছে। তবে আমার প্রোগ্রামিং এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা এতে সাহায্য করেছে। সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল সাইটটিকে দেখতে আকর্ষণীয় এবং ব্যবহারবান্ধব করে তোলা।”
তার এই উদ্যোগের প্রশংসা এখন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। যাত্রীরা জানাচ্ছেন, প্রতিদিনের যাতায়াতে এটি এক বাস্তব সহায়ক টুল হিসেবে কাজ করছে। কেউ লিখেছেন, “এটা শুধু একটা ওয়েবসাইট নয়, বরং প্রতিদিনকার ঝামেলা থেকে মুক্তি। এখন আর বারবার বিভিন্ন লিংকে যেতে হয় না।”
টিটিসির কর্মকর্তারাও ইলারসিচের এই কাজের প্রশংসা করেছেন। সংস্থার মিডিয়া রিলেশনস অফিসার স্টুয়ার্ট গ্রিন বলেন, “আমাদের পর্ষদ সদস্যরা ওয়েবসাইটটি দেখে অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছেন। এটি স্পষ্ট করে দেখিয়েছে, প্রযুক্তি কীভাবে সাধারণ মানুষের যাত্রাকে আরও সহজ করে তুলতে পারে।”
টিটিসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ভবিষ্যতে ইলারসিচের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করতে আগ্রহী, যাতে সরকারি ওয়েবসাইটেও এ ধরনের একীভূত তথ্যপ্রদানের ব্যবস্থা করা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীদের কাছ থেকেও ইলারসিচ ব্যাপক উৎসাহ পেয়েছেন। তারা বলছেন, এটি শুধু একটি একাডেমিক বা প্রযুক্তিগত প্রকল্প নয়, বরং এক মানবিক উদ্যোগ যেখানে জ্ঞানের ব্যবহার সরাসরি নাগরিক জীবনে প্রভাব ফেলছে।
অ্যান্ড্রু ইলারসিচ বর্তমানে ওয়েবসাইটটির আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করছেন, যেখানে যাত্রীরা সরাসরি রুট নির্ধারণ করতে পারবেন, বিকল্প লাইন খুঁজে পাবেন এবং হঠাৎ পরিষেবা ব্যাঘাতের ক্ষেত্রেও তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাবেন।
টরন্টোর মতো ব্যস্ত মহানগরে যেখানে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ ট্রানজিট নির্ভর জীবনে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেন, সেখানে ইলারসিচের এই ওয়েবসাইটটি এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এককথায়, এটি প্রমাণ করেছে উদ্যোগ আর প্রযুক্তি একসাথে এলে শহরের জীবনও হতে পারে আরও সহজ, আরও মানবিক।

