
টরন্টোর ব্যস্ত নগর জীবনে এক নারী নিজের উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে ফাস্ট ফুডের ধারণাটিই বদলে দিয়েছেন। তিনি হলেন ইজি পেত্রাগলিয়া — পেশায় ফ্রিল্যান্স লেখক ও প্রকাশক। প্রতি সোমবার টরন্টো ট্রানজিট কমিশন (টিটিসি) সাবওয়ে ট্রেনে তিনি আয়োজন করেন এক অভিনব বুফে ডিনারের, যেখানে সাধারণ যাত্রীরা বিনামূল্যে খাবার উপভোগ করতে পারেন।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইজি শহরের যাত্রীদের জন্য তৈরি করেছেন এক নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা, যা একদিকে বিনোদন, অন্যদিকে মানবিকতা ও সামাজিক সংহতির প্রতীক। তিনি ও তার কয়েকজন বন্ধু সন্ধ্যা সাতটার দিকে টিটিসির লাইন ১ সাবওয়ের একটি বগিতে বসিয়ে দেন একটি পূর্ণাঙ্গ বুফে টেবিল। খাবারের আয়োজন, পরিবেশনা ও সজ্জা—সবকিছুই তারা নিজেরা করেন।
এই ধারণার উৎস নিউ ইয়র্ক সিটির সাবওয়ে ট্রেনে অনুষ্ঠিত এক ভাইরাল “থ্যাংকসগিভিং ডিনার” ভিডিও। সেই ভিডিও দেখেই অনুপ্রাণিত হন ইজি পেত্রাগলিয়া। তিনি বলেন, “ভিডিওটি দেখার পর থেকেই ভাবছিলাম এমন কিছু করা উচিত, যা আনন্দও দেবে আবার মানুষকে এক করবে। কয়েক সপ্তাহ ভেবেচিন্তে অবশেষে একদিন বললাম, আমি এটা করব।”
তিনি নিজ হাতে প্রস্তুত করেন প্রতিটি খাবার। তার মেনুতে থাকে নানান বৈচিত্র্যময় ডিশ—স্পাইসি মিসো শসা সালাদ, ফিলিপিনো প্যানচিট বিহন নুডলস, সুইট অ্যান্ড স্পাইসি টোফু, বিভিন্ন ধরনের কুকিজ এবং পানীয়। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ হচ্ছে “উবে হোয়াইট চকোলেট কুকিজ”—যা অনেক যাত্রীই দ্বিতীয়বার চেয়ে নেন।
খাবার পরিবেশন শুরু হয় গ্লেনকেয়ার্ন স্টেশন থেকে, তারপর ট্রেনটি ফিঞ্চ পর্যন্ত যায় এবং আবার ফিরে আসে। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে এই আনন্দঘন আয়োজন চলে। যাত্রীরা প্রথমে কৌতূহল নিয়ে তাকালেও, ধীরে ধীরে অনেকেই এতে অংশ নিতে শুরু করেন। কেউ কেউ ছবি তোলেন, কেউ আবার ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাবওয়ে বগিটি পরিণত হয় হাসি, গল্প আর খাবারের এক উষ্ণ মঞ্চে।
ইজি পেত্রাগলিয়া বলেন, “শুরুর দিকে অনেকেই হাসছিলেন, কেউ কেউ ভাবছিল এটা হয়তো কোনো প্র্যাঙ্ক। কিন্তু পরে যখন একজন নারী জানালেন তিনি বারো ঘণ্টা টানা কাজ করে ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছিলেন, আর আমার খাবার তাকে স্বস্তি দিয়েছে—তখন বুঝলাম, এই আয়োজনের প্রকৃত মূল্য কতটা গভীর।”
তিনি জানান, তার এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু খাবার পরিবেশন নয়; বরং ব্যস্ত নগর জীবনের যান্ত্রিকতার ভেতর কিছুটা মানবিক স্পর্শ ফিরিয়ে আনা। প্রতিদিন যে মানুষগুলো একই ট্রেনে মুখোমুখি হয়েও একে অপরকে চেনে না, তাদের জন্য সামান্য সময়ের এক সামাজিক মুহূর্ত তৈরি করাই তার লক্ষ্য।
ইজি বলেন, “আমি চাই মানুষ বুঝুক, ছোট্ট কিছু দান বা সহমর্মিতা কত বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কেউ হয়তো আমার দেওয়া এক প্লেট খাবার খেয়ে দিনের শেষে হাসতে পারবে, সেটাই আমার অর্জন।”
টিটিসি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য না করলেও, যাত্রীদের মধ্যে এই আয়োজনকে ঘিরে ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইজির ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত, এবং অনেকেই তার মানবিক উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। কেউ লিখেছেন, “টরন্টোর কোলাহলের ভেতরও এমন উষ্ণ হৃদয় আছে, এটা বিশ্বাস করায় ইজি।”
ইজির বন্ধুরা জানিয়েছেন, এখন অনেকেই তাদের দলে যোগ দিতে চাচ্ছেন। কেউ খাবার সরবরাহ করতে চান, কেউ ট্রেন সজ্জায় সাহায্য করতে আগ্রহী। পরবর্তী ধাপে তারা মাসে একবার বিশেষ “কমিউনিটি বুফে নাইট” আয়োজনের পরিকল্পনাও করছেন, যেখানে স্থানীয় সংগঠনগুলো অংশ নেবে।
একটি শহরের জীবন যেখানে প্রতিদিনের ব্যস্ততা মানুষকে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, সেখানে ইজি পেত্রাগলিয়ার এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে—একটু সদিচ্ছা, সামান্য সময় আর কিছু মমতা দিয়েও গড়ে তোলা যায় সম্প্রীতি ও আনন্দের সেতুবন্ধন।
টরন্টোর সাবওয়ে ট্রেনে তার এই বিনামূল্যের বুফে কেবল একটি অনন্য উদ্যোগ নয়, বরং এটি এখন শহরের মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

