
কানাডার চাকরি বাজারে স্পষ্ট শীতলতার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। নতুন করে কর্মী নিয়োগ কমে যাওয়ায় কিংবা অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ কার্যক্রম পুরোপুরি স্থগিত রাখায় দেশের শ্রমবাজারে উদ্বেগ বাড়ছে। সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আট বছরের মধ্যে কানাডায় চাকরির শূন্যপদের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মার্কিন বাণিজ্যনীতি এবং কানাডার অভ্যন্তরীণ বাজারের চাপ — এই তিনটি কারণ মিলেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ধীরগতি এনেছে। অনেক কোম্পানি এখন দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণের পরিবর্তে নিজেদের টিকে থাকা কার্যক্রমেই মনোযোগ দিচ্ছে।
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাসে দেশে মোট শূন্যপদ ছিল ৪ লাখ ৭৮ হাজার ২০০টি, যা ২০১৭ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন সংখ্যা। এর আগের মাসের তুলনায় মে মাসে শূন্যপদ কমেছে ২০ হাজার ৪০০টি বা ৪ দশমিক ১ শতাংশ। এপ্রিল মাসে এই হ্রাসের হার ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৪ সালের মে মাসের তুলনায় চলতি বছরের মে মাসে শূন্যপদ কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ।
শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ প্রবণতা কেবল সংখ্যার পরিবর্তন নয়, বরং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার গভীর প্রতিফলন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন পুনরায় আমদানি পণ্যে উচ্চ শুল্ক আরোপের পর উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য সম্পর্ক অস্থির হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়ছে কানাডার উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে। অনেক কোম্পানি শুল্কজনিত ক্ষতির আশঙ্কায় নতুন বিনিয়োগ ও নিয়োগ স্থগিত রেখেছে।
বাংলাদেশি কানাডিয়ান কমিউনিটি সার্ভিসেসের এক মুখপাত্র বলেন, “যদি কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগামী মাস বা প্রান্তিকে তাদের আয় বা বাজার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়, তাহলে তারা খরচ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেবে না—এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কেউ বলছে না যে কেউই কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে না, তবে সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে সবাই এখন সতর্ক। অর্থনীতির গতি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি নিতে চাইছে না।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমবাজারে এই শীতলতা আসলে অর্থনীতির এক রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করছে। কানাডার অনেক খাত যেমন প্রযুক্তি, খুচরা বিক্রয় এবং নির্মাণ—মন্দার আশঙ্কায় নিয়োগ কমিয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং পরিবহন খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা থাকলেও সামগ্রিকভাবে নিয়োগের হার কমেছে।
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিক থেকেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ধীর হতে শুরু করে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বড় কোম্পানিগুলো নতুন কর্মী নেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান কর্মীদের ধরে রাখাতেই জোর দিচ্ছে। এর পাশাপাশি আংশিক সময়ের চাকরি বা অস্থায়ী নিয়োগের হার বেড়েছে, যা কর্মবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তর আমেরিকার চলমান অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক বাড়ানোর প্রভাব কানাডার কর্মসংস্থানে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন বাজারে নতুন ঝুঁকি নিতে চাইছে না, বরং মুনাফা রক্ষায় ব্যয় সংকোচনকেই প্রধান কৌশল হিসেবে গ্রহণ করছে।
টরন্টোভিত্তিক অর্থনীতিবিদ পল হেন্ডারসন বলেন, “এখনকার পরিস্থিতি এমন এক সময়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যখন ব্যবসা সম্প্রসারণ নয় বরং বেঁচে থাকার লড়াইকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কানাডিয়ান অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকলেও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওঠানামা এবং শুল্ক নীতি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করেছে।”
চাকরির বাজারে এই মন্থরতা সরাসরি প্রভাব ফেলছে তরুণ ও নতুন স্নাতকদের ওপর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন অনেক তরুণ ভালো চাকরি পাচ্ছেন না, কিংবা পাচ্ছেন অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক কাজ। শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে উঠেছে এবং চাকরির সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে।
কানাডার শ্রমনীতি পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই সংকট কাটাতে সরকারকে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে তারা নিয়োগ কার্যক্রমে ফিরে আসতে পারে। পাশাপাশি প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
বর্তমান চিত্রে দেখা যাচ্ছে, কানাডার অর্থনীতি এখনো স্থিতিশীল অবস্থায় থাকলেও শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তার সঙ্কেত স্পষ্ট। শূন্যপদ হ্রাসের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে বছরের শেষ নাগাদ সামগ্রিক কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধিও নিম্নমুখী হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এখনই সময় শ্রমবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার। না হলে, চাকরির সংকট আগামী বছর কানাডার অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

