টানা দ্বিতীয় মাসের মতো কানাডার জিডিপি সংকোচন

টানা দ্বিতীয় মাসের মতো কানাডার জিডিপি সংকোচন - the Bengali Times
চলতি বছরের মে মাসে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো কানাডার অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে

চলতি বছরের মে মাসে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো কানাডার অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েন, ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস — এই তিনটি কারণ মিলেই দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা এনেছে। সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মে মাসে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আগের মাসের তুলনায় কমেছে ০ দশমিক ১ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যদিও এই হার খুব বেশি নয়, তবে এটি সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক গতির দুর্বলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। কারণ, এপ্রিল মাসে জিডিপি ছিল স্থিতিশীল, মার্চের সমান পর্যায়ে। এর আগে অধিকাংশ অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন যে মে মাসে জিডিপি কমবে প্রায় ০ দশমিক ২ শতাংশ, তবে বাস্তবে তার চেয়ে কিছুটা কম হারে সংকোচন দেখা গেছে।

- Advertisement -

কানাডার অর্থনীতিতে এই ধীরগতি মূলত এসেছে মার্কিন শুল্কনীতির প্রভাবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নতুন করে যে সব শুল্ক আরোপ করেছে, তার ফলে আমদানি-রপ্তানি খরচ বেড়েছে এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সেই অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে শুরু করেছে। এর ফলেই ভোক্তাদের দৈনন্দিন খরচ বেড়েছে, অথচ আয় একই রয়ে গেছে। ফলে খুচরা খাতে বিক্রি কমে গেছে, যা সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলেছে।

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসে সবচেয়ে বেশি সংকোচন দেখা গেছে খনি, খনিজ উত্তোলন এবং পাথর খনন খাতে। তেল ও গ্যাস খাত বাদ দিলে এই অংশে সংকোচনের হার দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ১ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। খুচরা বাণিজ্য খাতেও প্রবৃদ্ধি নেমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। গাড়ি ও যন্ত্রাংশ বিক্রির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

যদিও মার্চ ও এপ্রিল মাসে মোটরযান বিক্রি সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছিল, মে মাসে তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তবে বার্ষিক তুলনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের মে মাসে মোটরযান ও যন্ত্রাংশের বিক্রি ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক হলেও স্বল্পমেয়াদে বাজারের অস্থিরতা কাটেনি।

অন্যদিকে, কিছু খাত অর্থনৈতিক মন্দার মাঝেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আবাসন, রেন্টাল এবং লিজিং খাত। মে মাসে এই খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ০ দশমিক ৩ শতাংশ, যা টানা দ্বিতীয় মাসে উন্নতির ইঙ্গিত দেয়। বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, সম্পত্তি পুনর্নির্মাণ এবং স্বল্পমেয়াদি লিজ ব্যবসার সম্প্রসারণ এই খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করেছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, কানাডার অর্থনীতি এখন এক ধরনের “অস্থায়ী ভারসাম্যের” মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ, এটি স্থিতিশীল হলেও বৃদ্ধির গতি খুবই ধীর। বিশ্ববাজারে বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব, তেলের মূল্য ওঠানামা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা ব্যবসায় বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। এর ফলে কোম্পানিগুলো নতুন প্রকল্প হাতে নিতে সাহস পাচ্ছে না, বরং বিদ্যমান কার্যক্রম চালু রাখতেই মনোযোগী হচ্ছে।

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা জানিয়েছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বছরের শেষ প্রান্তিকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে। তবে তারা আশা করছে, যদি শুল্কনীতি এবং সরবরাহব্যবস্থার সংকট কিছুটা প্রশমিত হয়, তাহলে ২০২৬ সালের শুরুতে অর্থনীতি পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি টানা দুই প্রান্তিক বা ছয় মাস ধরে জিডিপি কমতে থাকে, তাহলে সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্দা হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। যদিও এখনই দেশটি মন্দার মুখে পড়েনি, তবে এই ধীরগতি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ভোক্তা ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে।

কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সম্প্রতি জানিয়েছে, তারা সুদের হার বাড়ানোর বিষয়ে আপাতত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কারণ, উচ্চ সুদের হার ভোক্তাদের ব্যয় আরও কমিয়ে দিতে পারে, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে আরও কঠিন করে তুলবে।

অর্থনীতিবিদ র‍্যাচেল ডোনোভান বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ হলেও দীর্ঘস্থায়ী নয়। উৎপাদন ও বাণিজ্য খাতের সীমাবদ্ধতা কাটাতে না পারলে কানাডার অর্থনীতি স্থিতিশীল গতিতে ফিরে আসতে সময় লাগবে।”

সবমিলিয়ে, টানা দুই মাস ধরে কানাডার অর্থনীতি সংকোচনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—যা আগামী কয়েক মাসে দেশটির অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles