সিটি কর্পোরেশন নোট লিখে গেছে পরিষ্কার করতে

সিটি কর্পোরেশন নোট লিখে গেছে পরিষ্কার করতে - the Bengali Times
সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে তিনটা গার্বেজ বিন স্প্রে করে পরিষ্কার করলাম

সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে তিনটা গার্বেজ বিন স্প্রে করে পরিষ্কার করলাম।  এমনই দুর্গন্ধ হয়েছিল, সিটি কর্পোরেশন নোট লিখে গেছে পরিষ্কার করতে। এটার পর সবজি তুলে, বিতরণ করে কাল সকালে অটোয়া ফিরবো। বন্ধুর অনুরোধে দুই সপ্তাহ পরপর টরন্টো এসে তার বাগানে কাজ করে সবজি নিয়ে যাই।

কাল রাত এগারোটা পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করেও আমরা সবজি বিতরণ শেষ করতে পারিনাই  নাই। আজ রবিবারের মধ্যে শেষ করতেই হবে। দশজনের জন্য সবজি তুলে, প্যাকেট করে প্রিপারেশন করা খুব কঠিন কাজ। গতকাল চিশতী নিজেই সবজি তুলেছে। আমি নাকি পারবো না। আমার কাজ ছিল সবজি ধুয়ে পরিষ্কার করা, বাগান সাফ করা। তাও হাজারটা কথা শুনতে হয়েছে; এ পারিনা, ও পারি না..।

- Advertisement -

বন্ধুর মেজাজ সকাল আটটা পর্যন্ত বেশ খারাপ ছিল।

সকালে প্রচুর শুকনা মরিচ মাখানো আর বাগানের সবজি দিয়ে বানানো ঢ্যালঢেলা খিচুড়ি খেয়ে বিড়ি ধরিয়ে বাথরুমে ঢুকলো। বিশ মিনিট পর ঘেমে বের হয়ে টেবিল ফ্যানের নিচে বসলো। তার পর থেকে মেজাজ ফুরফুরে। নিজের হাতে লেবু চিপে, বরফ কুচি দিয়ে দুই গ্লাস লেমোনেড বানিয়ে আমার হাতে এক গ্লাস ধরিয়ে বলল- বুঝলি রিপন, তুই খিচুড়ি ভালই বানাস।

লেমোনেড খেয়ে এবার আমি ঢুকলাম। বাথরুম থেকে বের হয়ে সোফায় বসতেই বলল- চল? আবার বসলি যে? কালকে মেহমান আসবে; এক গাদা বাজার করে, সবজি তুলে বিতরণ করতে হবে

– একটু দম নি

– রেস্ট নেয়ার অনেক সময় পাবি। সবজি আজকে তুই তুলবি; তোকেও শিখতে হবে।

আমাকে টান দিয়ে উঠিয়ে গাড়িতে তুলল। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে আবার বন্ধ করে ফেলল।

বললাম- কী হইছে দোস্ত?

– দেখতেছিস না লুঙ্গী পইড়ি চৈলি আইছি?- বলে ডিপজলের মতো মার্বেল চোখ বানিয়ে আমার দিকে কটমট করে চেয়ে থাকলো। তার লুঙ্গি পাল্টিয়ে প্যান্ট পরানোর দায়িত্বও যেন আমার। অথচ আমি যদি এরকম ভুল করতাম ভাই রে ভাই, নির্ঘাৎ ফাঁসি দিতো!

.

রোববারে ফ্রেশকো দোকানে খুব ভীড়।

ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে বন্ধুর পিছে হাঁটতে থাকি। তার পরনে বাদামি তসর সিল্কের পাঞ্জাবী। মাথায় জিন্নাহ টুপি; তার দাদার কাছ থেকে পাওয়া। সুফী সুফী ভাব নিয়ে আছে। হাত ব্যান্ডেজ করা। কাল বাগানে কাজ করতে গিয়ে হাত কেটে ফেলেছে। কতোটা কেটেছে, সেটা অবশ্য দেখায়নি..। কাজ না করার ফন্দিও হতে পারে।

সে বলল- চারটা ভেড়ার ঠ্যাং, স্যামন, আস্ত মুরগী নিবি।

ফোর নাইন্টি নাইন পাউন্ড করে ভেড়ার রান দিচ্ছে। সে অবশ্য দামের জন্য এখানে আসেনি, এই রান এইট নাইন্টি নাইন করে হলেও কিনতো। সে আমার মতো ফ্লায়ার দেখে কেনে না। তার টাকা নিয়ে চিন্তা নাই।

তার বাজার করার স্টাইল খুব অর্গানাইজড। প্রথমে ভারি চাল, ডাল, আটা, পানি, নিয়ে কার্ট ভরানোর পর হালকা বাজার করবে, চ্যাপ্টা হবার ভয়ে।

ফোনে অনবরত কথা বলেই যাচ্ছে। চালের স্তুপের কাছে এসে ইশারা করে তিনটা আংগুল দেখালো। আমি চল্লিশ পাউন্ডের তিনটা বস্তা তুলে ফেললাম ট্রলির নীচে। পানি তোলার পর শপিং কার্টের চাকা ঘটাং ঘটাং আওয়াজ শুরু করে থেমে যাবার উপক্রম হলো। সবাই মনে মনে বলছে, ব্যাচারা! মানুষ অন্যকে বিপদে পড়তে দেখলে আনন্দ পায়।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের “সংগ্রাম” পেইন্টিং এর মতো ঝুঁকে শরীর নাইন্টি ডিগ্রি বাঁকিয়ে ট্রলি ঠেলতে থাকি।

মাংস সেকশনে এসে দেখি ভেড়ার রান সব শেষ। চিশতী এক কর্মীকে ডেকে আনলো। এই কাজ সে আগেও করেছে, বাজারে আসলেই ঝগড়া বাধাবে।

কর্মী বলল, আজকে আর পাবেন না, কালকে আইসেন।

এবার ম্যানেজারকে ডেকে এনে বলল, ভেড়ার রান ফ্লায়ারে ছিল। আমরা অনেক দূর থেকে আসছি। আপনি কোথা থেকে আনবেন জানি না; যেভাবে পারেন নিয়ে আসেন।

ইন্ডিয়ান ম্যানেজার ভদ্রভাবে বললেও সে নাছোড়বান্দা। সে আরও দেখালো শপিং কার্টের চাকা নষ্ট। আমিও তাল মিলিয়ে বললাম, দেখেন  ঘামতে ঘামতে আমার কি অবস্থা, কী করো তোমরা! এই তোমাদের কাস্টমার কেয়ার? ঠেলতে ঠেলতে আমার খিদে লেগে গেল। খরচ তো আরও বাড়িয়ে দিলা? এখন আমাদের বাইরে গিয়ে খেতে হবে।

ম্যানেজার কর্মীকে ডেকে সব গ্রোসারি অন্য কার্টে উঠিয়ে দিল। কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হলো। তার হাতে সময়ও নেই, আমরা দ্রুত বেরিয়ে আসলাম। রাগে কাঁপত কাঁপতে বের হয়ে আসলো। গাড়িতে বাজার  উঠানোর সময় বললাম- দোস্ত, মশলা আর  চিজ এর দাম দেয়া হয়নি

– কেন!

– আমার হাতে আরেক ব্যাগে ছিল। খেয়াল করিনি।

– তোর চোখ কোনখানে থাকে? বাঙালি ভাবিকে দেখে খেজুরে আলাপ শুরু করলি, সজনে ডাটা তুলে দিলি। মরিচ, ঢেঁড়স বেছে দিলি। তুই ঢেঁড়স ভাঙিস কেন? বেটা বাঙালি! মন পড়ে থাকে তোর অন্যদিকে। তুই বিল দিয়ে আয়

– আরেকদিন দি?

– কালকে তুই বাঁচবি তার কোনো গ্যারান্টি আছে? আসার সময় দোকানের বারান্দায় রাখা খালি দশটা বড় কার্টুন নিয়ে আসিস।

আমি মশলার ব্যাগ হাতে কাউন্টারে বিল দিতে দাঁড়াই। দুই প্যাকেট এলাচ বিশ ডলার, দুই প্যাকেট গরম মসলা ষোলো ডলার, জিরা দুই প্যাকেট আঠারো, নাটমেঘ সাত, জয়ত্রী দশ, গুড়া ধনিয়া লাল মরিচ জিরা মিলিয়ে পনেরো ডলার। চিজ বারো ডলার।

বিল আসলো আটানব্বই ডলার। সাথে ট্যাক্স যোগ হবে।

কি সর্বনাশ!

.

.

বাজার শেষে চালের বস্তা ঘাড়ে করে বেইজমেন্ট রাখার যে কি কষ্ট, সেটা যে করে সে জানে। সে কোনে কাজ করলো না। আমার ধারণা এসব কাজ সে আমার জন্য জমিয়ে রাখে। আবার বলে আমি নাকি কাজ করি না।

বন্ধুর বাগানে সোনা ফলেছে বরাবরের মতো।

লাউ, শিম, মিষ্টি কুমড়া, ঢেঁড়শ, লালশাক, পুঁই শাকের বাম্পার ফলন। এবারের ইউনিক ফলন উচ্ছে আর করলা। হাজার হাজার, টনখাবেক তো হবেই। সবুজ পাতার নিচে কি চমৎকারভাবে ঝুলছে! গাছগুলোও বেশ হৃষ্টপুষ্ট।

আমাকে সে পনেরো মিনিট ধরে ইনসট্রাক্টশন দিল। তারপর সে বাড়ি বিক্রির কাজে লইয়ার ফার্মে চলে গেল।

এক গাদা লাউ শাক তুলে মালার মতো রিং বানালাম দশ আঁটি। দশটা লাউ, পাঁচটা বিশাল সাইজের মিষ্টিকুমড়া তুলে অর্ধেক করে কেটে দশ পিস বানালাম।

লাল শাক, পুঁই শাক তুলে দাড়িপাল্লায় মেপে এক কেজি করে দশ আঁটি বাধলাম। এক কেজি করে করলা, ঢেঁড়শ, আধা কজি করে উচ্ছে, শিম, কাঁচামরিচ আধা কেজি, দুই কেজি করে টমেটো; সব আইটেম দশ প্যাকেট করে। সাথে দশ পিস করে বোম্বাই মরিচ বোনাস।

তারপরও বাগান ভর্তি সবজি।

এরকম আরও দুইবার তোলা যাবে। পাক্কা তিন ঘন্টা লাগলো। তবুও সে ফিরে এসে বলল, এখনো ফিনিস করতে পারিসনি! ফেইসবুক নিয়ে পড়ে ছিলি নাকি?

আমি দশ কার্টুন ভর্তি সবজি তার গাড়ির পেছনটায় সাজাই।

আমরা একেকটা বাড়িতে থামছি আর আর দৌড়ে গিয়ে বাড়ির মেইন দরজার সামনে রেখে কলিংবেল টিপছি। কেউ বেরিয়ে এলে সালাম দিয়ে চলে আসছি।  প্রথম ব্যক্তি একটু দাঁড়ান বলে এক প্যাকেট প্রিমিয়াম সুইটস এর মিষ্টি ধরিয়ে দিলো। আরও তিন জায়গা থেকে বিরিয়ানি, মাংস, নান প্যাকেট করে দিলো। অনেকের বাসায় দাওয়াত চলছে। আরেক বাসা থেকে দিলো বিফ বার্বিকিউ; ব্যাকিয়ার্ডে চলছে রিব ফাস্ট। এক বাসা দিলো চা, সিঙ্গারা, লুচি।

অন্য পাঁচ বাসা থেকেও দিতে চাচ্ছিলো, সময়ের অভাবে নিতে পারিনি। বাকি থাকলো শেষ বাসা। এখন রাত সাড়ে নয়টা বাজে। মিসিসাগায়। এই বাসায় আলো জ্বলছে। এই বাসা স্পেশাল।  আমাকে বলেছিল সবকিছু ডবল দিতে। এই ভদ্রলোকের সাথে তার বিয়াই-বেয়ান সম্পর্ক।

এবার আমি দিয়ে আসি, তুই বসে থাক- বলে সে নেমে গেল।

গাড়ির পিছনের ডালা খুলে আবার আমার কাছে এসে বলল, রিপন একটু আয় তো। সবজির বাক্সটা দেখ ভালো করে..

আমি ঝুঁকে ভালোমতো দেখে বললাম, ঠিকই তো আছে?

সে একবার আমার দিকে, আরেকবার সবজির দিকে চেয়ে বোবা বনে গেল। কিছুক্ষন পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল, বেছনের সব পাকা লাউ তুলে ফেলছিস! শসার শাক খাওয়া যায়? লাউ আর শসা গাছ এক? উচ্ছের প্যাকেটে মিনি করলা কেন? ভাবছিস উচ্ছে বড় হয়ে করল্লা হয়? মান ইজ্জত  আর রাখলি না!

সে ধ্রিম করে হুড বন্ধ করে বাসার দিকে রওনা দিল।

আমি সামনের রাস্তায় ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকি..

আমার অবশ্য পরেরদিন সকালে আর অটোয়া ফেরা হয়নি। পুনরায় সবজি তুলে প্রতিটা বাড়ি গিয়ে আগেরগুলো ফেরত নিয়ে নতুন করে দিয়ে আসতে হয়েছে।

আমার ভাগ্যে লাউ কুমড়া না জুটলেও মনখানেক নতুন আলু জুটেছে।

বাম্বার ফলন..

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles