
উত্তর আমেরিকার অটোমোবাইল শিল্পে চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যে জেনারেল মোটরস (জিএম) কানাডার ওশোয়া প্লান্টে উৎপাদন কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় ৫,০০০ শ্রমিকের সাপ্তাহিক কাজের সময় ৪০ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৩৫ ঘণ্টা করা হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ১২–১৫ শতাংশ আয় কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
জিএম কানাডার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে পিকআপ ট্রাক ও এসইউভি বিক্রি গত বছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গাড়ি বিক্রি কমে যাওয়ায় কোম্পানি উৎপাদন পরিকল্পনা পুনর্গঠনে বাধ্য হয়েছে। বাজারে বিদ্যুৎচালিত গাড়ির চাহিদা বাড়লেও গ্যাসচালিত গাড়ির চাহিদা স্থবির, যা ওশোয়া প্লান্টের উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
প্লান্টে ফুল-টাইম শ্রমিকদের পাশাপাশি শত শত চুক্তিভিত্তিক কর্মী রয়েছেন। তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। অনেকের অতিরিক্ত শিফট ও ওভারটাইমের সুযোগ বাতিল হয়েছে, ফলে আয়ের বড় অংশ হারাতে হচ্ছে। এক শ্রমিক বলেন, “আমরা জানি বাজারে মন্দা চলছে, কিন্তু আয় হঠাৎ এত কমে যাবে ভাবিনি। পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।”
শ্রমিক ইউনিয়ন ইউনিফর লোকাল ২২২ ইতোমধ্যেই কোম্পানির সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেছে। ইউনিয়নের দাবি, কর্মীদের জন্য আংশিক বেতন সহায়তা চালু করতে হবে অথবা উৎপাদন দ্রুত পূর্ণ ক্ষমতায় ফেরানোর স্পষ্ট রোডম্যাপ দিতে হবে। ইউনিয়ন নেতারা জানান, “কোম্পানি লাভে থাকলেও শ্রমিকদের ক্ষতি কমাতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
ওশোয়ার অর্থনীতির ওপর জিএম প্লান্টের প্রভাব বিশাল। স্থানীয় চেম্বার অব কমার্সের হিসাব বলছে, এই প্লান্ট ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীদের কার্যক্রম শহরের মোট অর্থনীতির প্রায় ২৫ শতাংশ। শ্রমিকদের আয় কমে গেলে শহরের রেস্টুরেন্ট, গ্যাস স্টেশন, মুদি দোকান ও ছোট ব্যবসাগুলোর বিক্রিও কমছে। এক রেস্টুরেন্ট মালিক জানান, “প্লান্টের কর্মীরা কম খরচ করছেন, আমাদের দৈনিক বিক্রি গত মাসের তুলনায় অন্তত ২০ শতাংশ কমে গেছে।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, ওশোয়া প্লান্টের এই ধীরগতি গোটা অটোমোবাইল শিল্পের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। সরবরাহ শৃঙ্খল সংকট কিছুটা কাটলেও উচ্চ সুদের হার, ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং বিদ্যুৎচালিত গাড়িতে রূপান্তরের সময়কাল শিল্পখাতে চাপ তৈরি করছে। কানাডার জাতীয় ব্যাংকের এক বিশ্লেষক বলেন, “পরিবর্তনশীল চাহিদা এবং নীতিগত চাপের কারণে গাড়ি শিল্পকে বড় ধরনের কাঠামোগত সমন্বয় করতে হবে।”
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ইউনিয়ন ও ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, বাজারে চাহিদা স্বাভাবিক হলে জিএম উৎপাদন পুনরায় বাড়াবে এবং কর্মঘন্টা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের দিকে ধীরে ধীরে হলেও স্থায়ী রূপান্তর না ঘটলে গ্যাসচালিত গাড়ির বাজারে এ ধরনের মন্দা বারবার দেখা দিতে পারে।
ওশোয়ার জন্য জিএম প্লান্ট শুধুমাত্র একটি কারখানা নয়, এটি শহরের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড। তাই এই ধীরগতি যদি দীর্ঘমেয়াদী হয়, তবে এর প্রভাব শ্রমিক থেকে শুরু করে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে, যা কানাডার অটোমোবাইল শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।

