
“যেভাবে সবখানে মারামারি, কামরা-কামড়ি লাগছে, তাতে ফেব্রুয়ারী আসতে আসতে দেশের ছালচামড়া কিছু বাকি থাকে কীনা—সন্দেহ!” কুদ্দুস বয়াতির এ কথাটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
কুদ্দুস বয়াতির সংযোগ দেশের লক্ষ কোটি সাধারণ মানুষের সাথে। তিনি মানুষের জন্য গান গেয়ে বেড়ান, মানুষকে আনন্দ দেন, নিজেও আনন্দে থাকেন। আমার মনে হয় দেশের বেশিরভাগ মানুষ তাকে চেনে। কুদ্দুস বয়াতির দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে আমি জানিনা। তার সম্পর্কে যা জানি, তা হল—তিনি গানের মানুষ। সব সময় সঙ্গীত নিয়ে থাকেন। কিন্তু রাজনীতিকে তো অশ্বীকার করতে পারেন না। তার গানের ভক্ত সব দলের ও মতের মানুষ। সে জন্য বোধ হয় শিল্পিরা দলীয় রাজনীতিতে নিজেদেরকে জড়ান না। তবে এ ক্ষেত্রে মমতাজ ভিন্ন। তিনি এর বাইরে গিয়ে ধরা খেয়েছেন। ফলাফল—এখন জেলে আছেন।
কুদ্দুস বয়াতি নিরপেক্ষ কথা বলেছেন। তার কথায় যথেষ্ট যুক্তি আছে।
দেখুন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্থানীয় গ্রামবাসীদের সাথে ঝগড়া বাঁধিয়ে প্রো-ভিসি সহ শ’খানেক শিক্ষার্থী এখন আহত। স্থানীয় গ্রামবাসী শিক্ষার্থীদের ওপর কেন এত ক্ষেপে গেল তা বোধগম্য নয়। বলা হচ্ছে, বিএনপি দলীয় একজন নেতা গ্রামবাসীকে উস্কে দিয়েছেন। অবশ্য বিএনপি তাকে বহিষ্কারও করেছে।
ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কম্বাইন্ড ডিগ্রির দাবিতে মাসখানেক ধরে আন্দোলন করছিল। গতকাল একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিং এ অংশগ্রহণরকারী দু’শোর মতো শিক্ষককে তালা দিয়ে ঘর বন্ধ করে জিম্মি করে রাখল। খবরে জানা গেল, পরে বাইরের লোকজন এসে তাদের উদ্ধার করেছে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে অনিদিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও গ্যান্জামের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা নাকি কোষাধ্যক্ষের অফিসে তালা মেরে রেখেছিল নতুন শিক্ষার্থীদের ভোটার করার দাবীতে। ওখানেও সহিংসতা ছড়াতে পারে।
ঢাকায় জাতীয় পার্টির সাথে গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষের জেরে ভিপি নুরকে পুলিশ-সেনাবাহিনী পিটিয়ে মাথা ফাটেয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। সেটা নিয়ে জাতীয় রাজনীতি টালমাটাল।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ও বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরি সংক্রান্ত দ্বন্দে আরেক কলোহল-কোন্দল। আর প্রতিদিন দেশে নানা জায়গায় মব চলছেই। লোকজন মরছেই।
এরই মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদের নির্বাচন দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এ নির্বাচনগুলোকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসগুলোর পরিস্থিতি আবারও সহিংস হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
জাতীয় নির্বাচন নিয়ে জামাত ও এনসিপির টালবাহানা শুরু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তারা এখন যে পরিমাণ ক্ষমতা চর্চা করছে—নির্বাচনে বিএনপি জিতে সরকার গঠন করলে তাদের সেই ক্ষমতা আর থাকবে না। সে জন্য মনে হয় তারা নির্বাচনের ব্যাপারে আগ্রহী নয়। যদিও তারা ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে তৈরীকৃত জুলাই সনদের গ্যারান্টি, জুলাই গণহত্যার বিচার, নতুন সংবিধান তৈরীর জন্য গণপরিষদ নির্বাচন ও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবীর কথা বলে আসছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এনসিপি ও জামাত ইউনূস সরকারকে দিয়ে অনেক কিছুই করিয়ে নিতে চায়, যা বিএনপি মানছে না।
বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে হয়তো এগুলোর বেশিরভাগই করে ফেলবে, কিন্তু এখন রাজী হচ্ছেনা। এখন করলে ক্রেডিটটা জামাত ও এনসিপি নিয়ে নিবে। আগামি নির্বাচনে এনসিপি ও জামাতকে যদি মানুষ ভোট দেয়, তাহলে তারা ক্ষমতায় গিয়ে যা যা পরিবর্তন করা দরকার, তা তারা করে নেবে—এরকম মনোভাব যদি তাদের থাকত, তবে বর্তমান সমস্যাগুলো সৃষ্টি হতো না। কিন্তু সে রকম মনোভাব দেখা যাচ্ছেনা। বরং নামে-বেনামে নানা রকম মব সৃষ্টি করে অরাজক পরিস্থিতি তৈরী করছে কেউ কেউ।
এ পরিস্থিতিতে পতিত আওয়ামীলীগও বসে নেই। তারাও নানাভাবে তাদের শক্তি জানান দেয়ার চেষ্টা করছে। শোনা যাচ্ছে, জাতীয় পার্টির মাধ্যমে তারা রাজনীতিতে ক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করছে। তা তারা করতেই পারে। কারণ, তারা তো বাংলাদেশের একটি বড় শক্তি। এটা তো অশ্বীকার করার উপায় নেই।
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলেও সব সমস্যার সমাধান যে হয়ে যাবে, তেমন আশা করাও ঠিক না। তবে জনমনে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। কিন্তু সেই ফেব্রুয়ারী তো বেশ দূরে। ততদিনে দেশের ছালচামড়া থাকবে তো?
স্কারবোরো, কানাডা

