
মানুষ সামাজিক প্রাণী। মানুষই সমাজ সৃষ্টি করে অথচ সে সমাজই মানুষকে পরিচালিত করে তার ইচ্ছা মতো। মানুষের জীবনে কত কথা থাকে যা কি-না একটু প্রকাশ করতে পারলে মন হালকা হয়, মনে শান্তি আসে। কিন্তু সমাজ আপনার মনের সুন্দর, আবেগময় কথাগুলো শুনতে অধিকাংশ সময়ই ভালো দৃষ্টিতে দেখে না। খুঁজে বের করে কিভাবে কথাগুলো এবং মানুষটাকে পচানো যায়। আর আমাদের মতো মানুষেরা‘ পাছে লোকে কিছু বলে’ ভেবে মনের কথা মনের মাঝেই লুকিয়ে রাখি। তবে আজকাল পাছে লোকে কিছু বলে জিনিশটা অনেকের মাঝেই নেই। মানুষ অনেক বাজে ধরনের সাহসী হয়ে উঠেছে। ভালো সাহসিকতা প্রশংসনীয়। কুৎসিত সাহসিকতা সমাজ ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর।
পিয়াস ছিল ছোটবেলা থেকে একজন খাদ্যসৌখিন মানুষ। খেতে যে ভালোবাস তো সেটা ওকে দেখলেই বোঝা যেতো। পিয়াসকে নিয়ে কুমিল্লা শহরে একটা মজার জোক ছিল। তখন কুমিল্লাতে পিয়াসের মতো গুল্লু গাল্লু একটা মেয়ে ছিল। যদিও মেয়েটিকে আমি কখনো দেখিনি। মেয়েটির নাম ছিল বিয়াশ। পিয়াসের বন্ধুরা তার ব্যাখ্যা করেছিল পিয়াস হলো মোটা আর বিয়াশ হলো মোটি। বন্ধুরা কেউ কাউকে যদি জিজ্ঞেস করতো, কেমন আছিস? অন্য বন্ধু জবাব দিতো ‘পিয়াস বিয়াশ’ মানে মোটামুটি। কুমিল্লার ছেলেদের রসিকতাবোধ ছিল প্রবল। পিয়াস যে শুধু খাদ্যপ্রিয় ছিল তা নয়। পিয়াস ছিল অত্যন্তÍ একজন রসিকতা করে কথা বলার মানুষ। অনেক কম বয়েসে চিনি ছড়িয়ে পড়েছিল ওর রক্তে। এতে পিয়াসের কিছুই আসে যায়নি। ওর খাদ্যতালিকা থেকে কিছুই বাদ পড়েনি। মিষ্টি তো একেবারে না। অনিয়ম করে করে হৃদযন্ত্রে সমস্যা দেখা দিলো। হৃদযন্ত্রে দুটো রিং পরতে হলো। এ নিয়েও তার রসিকতার কমতি ছিল না। কেউ তাকে দেখতে যেয়ে সহানুভূতি জানাতে গেলে পিয়াস হাসতে হাসতে বলতো, ‘কি করবো বলো আঙলে তো আর রিং পরা হবে না, তাই হৃদয়েই রিং পরে নিলাম।’ কোনো ব্যাপারে যদি মন খারাপ হতো তখন আমি পিয়াসকে ফোন করতাম। পিয়াস আমার সাথে প্রচুর হাসাহাসি ও এত মজার-মজার গল্প করতো যে হাসতে হাসতে পাঁচ মিনিটে মন ভালো হয়ে যেতো। ফোনে জোরে হাসাহাসি করতে দেখলেই আমার স্বামী বুঝতে পারতো আমি পিয়াসের সাথে কথা বলছি।
এই যে বললাম পিয়াসের কিছু কিছু বন্ধু আমারও বন্ধু ছিল, তাদের মধ্যে ফরিদের সাথে আমার যোগাযোগ আছে এখনো (ফরিদ মাজহার)। অত্যন্ত ভালো একটি মানুষ। ফেসবুকের বদৌলতে অনেক দূরে সরে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া অনেক বন্ধুকে আবার খুঁজে পেয়েছি। আবার এমন অনেককে খুঁজে পেয়ে খুশি হয়েছিলাম কিন্তু কিছুদিন যোগাযোগের পর আবার যোগাযোগ বিছিন্ন। শামীম ভাই (রেজাউল করিম শামীম)। পিয়াস এবং আমি আমাদের দুজনের সাথে শামীম ভাইয়ের হৃদ্যতা ছিল অনেক। অনেক ধরনের গল্প হতো আমার শামীম ভাইয়ের সাথে। ছাত্র বয়সে সখের ফটোগ্রাফার ছিলেন শামীম ভাই। আমার বিয়ের পরে শামীম ভাইয়ের সাথে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। কারণ বিয়ের পরপরই আমি বিদেশ চলে যাই। তারপর বহু বছর পরে ফেসবুকে শামীম ভাইকে খুঁজে পেয়ে অনেক আনন্দ হয়েছিল। মনে হয়েছিল হারিয়ে যাওয়া একজন ভাইকে খুঁজে পেয়েছি আবার। কিছুদিন বেশ যোগাযোগ থাকলো। আবার যোগাযোগ বিছিন্ন। আসলে আমি আমরা পৃথিবীর সবাই বড্ড বেশি ব্যস্ত। শওকত ভাই (শওকত আহসান ফারুক)। অত্যন্তÍ ভালো কবিতা লিখেন। তথ্যমূলক প্রচুর লেখা লিখে যাচ্ছেন ক্লান্তিহীনভাবে। কিশোর বয়েসে শওকত ভাইকে খুব ভালো করেই চিনতাম। কিন্তু উনার সাথে আমার তেমন কথাবার্তা কখনো হয়নি। পিয়াসের সাথে কখনো পিয়াসের খোঁজে এসেছেন আমাদের বাড়িতে। তবে একটা বিশেষ কারণে শওকাত ভাইকে নিয়ে আমরা অনেক মজা করেছি আড়ালে। ফেসবুকের মাধ্যমে শওকত ভাইকেও খুঁজে পেয়েছি।
পিয়াসকে নিয়ে কথা বলতে বলতে অনেকের কথাই মনে পড়ে গেল। আবার ফিরে আসি পিয়াসের কাছে। পিয়াস আমি তো তোকে সামনে রেখেই কথাগুলো বলছি। কই তুই তো আমাকে কিছু মনে করিয়ে দিচ্ছিস না। আমার কি এত কথা মনে আছে বলতো? এই দেখতো আসল কথাটাই বলতে ভুলে গেলাম, তোর হাতে যে একটা তার থাকতো আর সেটা সারাক্ষণ ঘুরাতে থাকতি। বলতি, তার না ঘুরালে তোর কোনো চিন্তা মাথায় আসে না। তার হাতে না থাকলে তোর অস্থিরতা বেড়ে যেতো। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় যেখানেই যেতিস তোর পকেটে এক টুকরো তার নিয়ে যেতিস। আম্মা সবসময় তোর তারের সাপ্লাই মজুত রাখতো। এমনকি যখন অধ্যাপনা করতি তখনো নাকি তোর অফিস রুমে তার রাখতি। এমন অদ্ভুত স্বভাব পৃথিবীতে আর কারো ছিল কি-না আমার জানা নেই।
খুবতো বলতি আমাদের, তোকে অনিয়ম করতে মানা করলে এত তাড়াতাড়ি মরবি না। একশত বছর বাঁচবি। কই তুই তো তোর কথা রাখলি না। কিছু বলা নেই কওয়া নেই হুট করে চলে গেলি। কারো কাছ থেকে বিদায় নেবারও কোনো প্রয়োজন বোধ করলি না। হাসপাতালে নেবার আগেই তুই চলে গেলি। কেন আমাদের ছেড়ে চলে গেলি বলতে পারিস। একবারও ভাবলি না তোর আর পাঁচটা ভাই-বোন, আমাদের বৃদ্ধা মা তোকে ছাড়া কী করে থাকবে?
ভাইরে, আমার যে আর কেউ থাকলো না, যার সাথে আমি মন খুলে আমার সুখ দুঃখের কথাগুলো বলতে পারি যেখানে কোনো কিছু সেন্সার করার কোনো প্রয়োজন থাকবে না। এত কথা লিখতে গিয়ে আমি কান্না ধরে রাখতে পারছি না, আর তুই কী করে নিষ্ঠুরের মতো আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিস। তুই শুধুই ছবি হয়ে গেলি আমাদের কাছে, কী করে মানা যায় কথাটা বলতো?
ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে কত কথা বললাম কিন্তু তোর সাথে কথা বলতে বসলাম সবার পরে। তোর কথা দিয়ে শুরু করলে আমি আর কারো কথাই লিখতে পারতাম না। তারপরও কবিগুরুর গানে বলবো…
দিনগুলো মোর সোনার খাঁচায় রইলো না
সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।
কান্না হাসির বাঁধন তারা সইলো না
সে যে আমার নানা রঙের দিনগুলো।
ম্যাল্টন, কানাডা

