বোনের বিয়ে

বোনের বিয়ে - the Bengali Times
বোনের বিয়ে

‘স্যার, আমার বোনকে বিয়ে করবেন?’

পল্টু নিচু গলায় কথাটা বলে।

- Advertisement -

পল্টু আমার ছাত্র। সে ক্লাশ সেভেনে পড়ে এবার। বয়সের তুলনায় ভীষণ দুষ্ট। সেদিন আমাকে বলছিল, ‘স্যার আপনাকে আর আসতে হবে না। আমি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছি। আব্বা, আম্মাকে এখনও বলিনি। আপনাকেই প্রথম বললাম।‘

কারণ জানতে চাইলে সে বলেছিল, পড়াশোনা করে খামোখা সময় নষ্ট করতে চায় না। তার সারা পৃথিবী ঘুরে দেখতে মন চায়। শিবরামের ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ গল্পটা পড়ার পর তার মনে হয়েছে বাইরের পৃথিবীটা এখনই না দেখলে নয়। সে যাত্রায় তাকে আমি অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে মাথা থেকে এমন অবাস্তব চিন্তা দূর করেছি। তাতে আমার নিজের একটা স্বার্থ আছে। পল্টুর বাবা, মা দুজনেই চাকরি করে। তাই মাস শেষে বেতনটা ভালোই দেয়। আমি চাই না পল্টু বাসা ছেড়ে পালিয়ে যাক।

কিন্তু এবারের এই অভিনব প্রস্তাব আমার খুব ভালো লাগল। কারণ আমার নিজের বাসা থেকেও বিয়ের জন্য পাত্রী দেখছে। যদিও আমার এখনও ধরাবাঁধা কোনো চাকরি হয়নি কিন্তু হবো হবো করছে। এদিকে আমার চাকরির বয়স পেরিয়ে বিয়ের বয়সও পেরিয়ে যাচ্ছিল। মাথার সামনের দিকে আগেরমতো সেই ঘন চুলের বন নেই। সেটা ফাঁকা হতে শুরু করেছে। তাই আমি পল্টুর প্রস্তাবে নড়েচড়ে বসলাম।

গলাখাঁকাড়ি দিয়ে বললাম, ‘কী বলছিলে তুমি, আবার বলো তো?’

পল্টু এবার গলা খাদে নামিয়ে বলে, ‘স্যার, আমার বোনকে বিয়ে করবেন? আমার বোন কিন্তু অনেক সুন্দর।‘

পল্টুদের বাসায় আমি মাস দুয়েক ধরে পড়াই। আসা যাওয়ার মাঝে এক দুবার একটা সুন্দর মেয়েকে দেখেছি বৈকি। মেয়েটা ভারী সুন্দর। গায়ের রঙ গমের মতো, টিকালো নাক, ছিমছাম শরীর, কপালের কাছে কুচোকুচো চুল পড়ে থাকে। তা দেখতে ভীষণ ভালো লাগে।

আমি সন্তর্পণে জিজ্ঞেস করি, ‘তা তোমার মা রাজি হবেন?’

পল্টু মাথা নেড়ে বলে, ‘খুব রাজি হবে। আমি মাকে আপনার কথা বলেওছিলাম। মা তো বলল, দেখ তোর স্যার রাজি হয় কিনা।‘

একথা শোনার পর আমার বুকের ভেতর কী যে আনন্দ হলো সেটা বলে বোঝাবার না। মনে হলো এক্ষণে এই বালককে বুকে জড়াই নেই। হবু শ্যালককে আদর দেই। আমার পকেটে দুটো বিদেশি চকলেট ছিল। এখানে আসার আগে আরেকটা বাসায় পড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে কে যেন বিদেশ থেকে এসেছে। তাই আমাকে দুটো চকলেট দিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম বাসায় গিয়ে খাব। কিন্তু এখন এই সদ্য সম্পর্ক হওয়া শ্যালককে এই চকলেট দেবার তাগিদ অনুভব করলাম।

চকলেট পেয়ে পল্টু খুব খুশি। আমিও মনের কোণে একটা সুখ অনুভব করছি। এখানে বিয়ে হলে আমি সারা জীবন পল্টুকে পড়াতে পারব।

সেদিন পড়ানো শেষে আমি পল্টুর রুম থেকে বের হতেই দেখি পল্টুর মা রান্নাঘরে। সঙ্গে পল্টুর সেই বোন। চোখাচোখি হতেই মেয়েটা হাসে। আহা! কী সুন্দর সেই হাসি। আমিও পালটা হাসি দিয়ে বের হয়ে আসি। আজ আর হেঁটে বাসায় ফিরি না। একটা রিক্সা নেই। আমার তো কষ্টের দিন প্রায় শেষ হতে চলল। ফুরফুরে বাতাস বইছে। ইশ, আর কদিন পরেই অমন সুন্দর একটা মেয়ে আমার পাশে বসে রিক্সায় ঘুরবে। ভাবনাটা ভাবতেই একটা অসাধারণ আনন্দের অনুভূতি হয়। ট্রাফিক জ্যামে আমি একটা বেলি ফুলের মালা কিনি। আচ্ছা, পল্টুর বোনের নামটাই তো জানা হলো না। আমি নিজেই তার একটা নাম দেই, বেলি। নাহ, নামটা ভালো হলো না। মেয়েটা কেমন পাখির মতো। পাখি নামটা থাকুক।

সেদিন রাতে আমি বারবার কোলবালিশ বুকে চেপে পাখির কথা ভাবি। তার ঘ্রাণ পাই। আদরে কোলবালিশে চুমু খাই। তাতে পাখি মানে কোলবালিশটা যেন লজ্জা পায়।

পরদিন পল্টুদের বাসায় আবার যাই। আজ যদিও পল্টুকে পড়ানোর কথা না। কিন্তু আমি দেরি করতে রাজি না। বিয়ের ব্যাপারে পল্টুর মায়ের সঙ্গে কথা পাকা করে রাখাই ভালো। দেরি হলে আবার এত সুন্দর মেয়েটা না ফস্কে যায়।

পল্টুর মা আমাকে দেখে অবাক গলায় বলেন, ‘সুমন, তুমি? আজ তো তোমার পড়ানোর কথা না।‘

আমি বিনয়ের সঙ্গে বলি, ‘আন্টি, আপনার সঙ্গে একটা জরুরি কথা ছিল। সেজন্যই আসা।‘

আন্টি আমাকে সোফায় বসতে বলে নিজেও বসেন। তারপর বলেন, ‘আচ্ছা, বলো কী বলবে।‘

আমি আমতা আমতা করে বলি, ‘আন্টি আমি রাজি।‘

আন্টি ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘তুমি রাজি মানে? কিসে রাজি?’

আমার কেমন লজ্জা লাগছে। নিজের বিয়ের কথা নিজের মুখে বলি কী করে। আবেগের বশে একাই চলে এসেছি। আব্বাকে বললে ভালো হতো। যাক, কথা যখন তুলেই ফেলেছি তখন আর লজ্জা রেখে লাভ নেই।

আমি ছোট্ট একটা কাশি দিয়ে বলি, ‘আন্টি, আপনার মেয়েকে আমি বিয়ে করতে রাজি।‘

আন্টির চোখ বড়ো বড়ো হয়ে যায়। অবাক গলায় বলে, ‘তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি মানে?’

আন্টির চোখমুখ দেখে আমার কেমন যেন পেট গুড়গুড় করে উঠে। আমি ঢোক গিলে বলি, ‘না মানে, আপনার ছেলে পল্টু সেদিন আমাকে সব বলেছে।‘

আন্টি কপাল কুঁচকে বলেন, ‘পল্টু কী বলেছে তোমাকে?’

আমি এবার সাহস করে বলেই ফেলি, ‘পল্টু বলেছে আমি চাইলে তার বোনকে বিয়ে করতে পারি। আন্টি, পাখিকে আমার খুব পছন্দ। আমি রাজি।‘

আন্টি অবাক গলায় বলেন, ‘পাখি কে?’

আমি সলজ্জ গলায় বলি, ‘আপনার মেয়ের নাম তো জানি না। তাই পাখি নাম রেখেছি।‘

আন্টি এবার সশব্দে হেসে উঠেন। তাই দেখে আমার মনের মেঘ কেটে যায়। তাহলে কি আন্টি মত দিলেন?

আন্টি এবার গলা বাড়িয়ে ডাক দেন, ‘পল্টু, তোর বোনকে নিয়ে এখানে আয় তো।‘

পাখিও আসবে? ইশ, মেয়েটা তো লজ্জা পাবে।

একটু পরেই পল্টু রুমে ঢোকে। কোলে সুন্দর একটা সাদা বিড়াল। পল্টু আমাকে দেখে সালাম দেয় আজ। কী ভদ্র ছেলে!

আমি জিজ্ঞাসু গলায় বলি, ‘পল্টু, তোমার বোনকে নিয়ে আসোনি?‘

এবার আন্টি হাসতে হাসতে বলেন, ‘নিয়ে এসেছে তো। পল্টু তোর বিড়ালটা স্যারের কোলে দে।‘

পল্টু এগিয়ে এসে একটা ফিচেল হাসি দেয়। তারপর বিড়ালটা আমার কোলে এগিয়ে দেয়। আমি বিড়ালটা নিয়ে অস্বস্তির গলায় বলি, ‘আন্টি, পাখি কই?’

এবার আন্টি হি হি করে হেসে উঠেন, তারপর সামলে নিয়ে বলেন, ‘এই বিড়ালটাই পল্টুর বোন। তুমি যার নাম দিয়েছ পাখি।‘

আমি হতবাক হয়ে বিড়ালের দিকে একবার তাকাই একবার পল্টুর মায়ের মুখের দিকে।

উনি বুঝিয়ে বলার ভঙ্গিতে বলেন, ‘আসলে আমার তো একটাই ছেলে। তাই পল্টু প্রায়ই বায়না ধরত, তার যদি একটা ছোট বোন থাকত তাকে সে খুব আদর করত। ওর এই জ্বালাতনে বিরক্ত হয়ে এই বিড়ালটা এনে দিয়েছি। বলেছি, এটাই তোর বোন। আর এটাও বলেছিলাম, ভাইদের অনেক দায়িত্ব। বোন বড়ো হলে তার বিয়েও দিতে হবে। সেজন্যই বুঝি পাজিটা তোমাকে বিয়ের কথা বলেছে।‘

আমি ফ্যালফ্যাল করে আন্টির দিকে তাকিয়ে থাকি কিছুক্ষণ। আমার মাথা ঘুরছে। এমন সময় বিড়ালটা ‘ম্যাঁও’ করতেই আমি ছিটকে উঠি। তাতে বিড়ালটা ভয় পেয়ে আমার কোল থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে। নামার সময় ব্যাটা আমাকে একটা খামচিও দেয়। পল্টু দৌড়ে বিড়ালটাকে কোলে নিয়ে আমার দিকে মিটিমিটি হাসে। দেখে মনে হচ্ছে খুব মজা পেয়েছে। ইচ্ছে করছে কান ছিড়ে ফেলি।

আমি অপ্রস্তুত গলায় বলি, ‘কিন্তু আপনাদের বাসায় মাঝে মাঝেই একটা মেয়েকে দেখি। সেদিন আপনার সঙ্গে রান্নাও করছিল। তাহলে কে সে?’

আন্টি মুখ চেপে হেসে বলে, ‘ওর নাম টুসি। আমাদের পাশের বাসায় থাকে। কদিন পরেই মেয়েটার বিয়ে হয়ে যাবে। ছেলে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, কানাডার ইমিগ্র‍্যান্ট। তাই বেচারি আমার কাছে সময় পেলেই রান্না শিখতে আসে।‘

আমার শুধু একটা কথাই মনে হয়, এই পৃথিবী এত নিষ্ঠুর কেন? টুসি কি ওনার মেয়ে হতে পারত না? আর পল্টুর কথা মতো আজ টুসির সঙ্গে আমার বিয়ের কথা ফাইনাল হয়ে যেত। তা না, বিড়ালের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছে। আর আন্টিও মিটিমিটি হাসছেন। লজ্জায় মুখ লুকানোর কোনো জায়গা খুঁজে না পেয়ে আমি বলি, ‘আন্টি, আজ আমি যাই। কাল আসব।‘

আন্টি আন্তরিক গলায় বলে, ‘এসো। আর ওষুধের দোকানে গিয়ে র‍্যাবিস ভ্যাক্সিন দিয়ে নিও। বিড়াল খামচি দিলেও এই ভ্যাক্সিন দিতে হয়। আর হ্যাঁ, এই ভ্যাক্সিনের দাম আমি দিয়ে দেব।‘

কিহ! ভ্যাক্সিন দিতে হবে। হায়, হায়। এই ছিল আমার কপালে।

সেদিন হাসপাতাল থেকেই ভ্যাক্সিন দিয়ে বাসায় ফিরি। তারা বলেছে মোট পাঁচটা ইঞ্জেকশন দিতে হবে। কপালে এত দুর্গতি ছিল আজ! পাখিকে তো পেলামই না উলটো বিড়ালের খামচি খেয়ে ইঞ্জেকশন দিতে হলো। পল্টুর উপর ভীষণ রাগ হয়। ওকে একটা শিক্ষা দিতে হবে। যত দ্রুত পারি বিয়ে করে নতুন বউ নিয়ে দেখিয়ে আসব। আর হ্যাঁ, সঙ্গে একটা দুষ্ট হুলো বিড়াল নিয়ে যাব। বলব, এই নাও তোমার বোনের জামাই।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles