
সংস্কারের একটা কারণ হলো দেশে ইনক্লুসিভ রাজনীতি ও নির্বাচন হবে। বিগত পনের বছরের শাসনকালে যে বিষয়টা প্রচন্ড বিরক্তিকর ছিল তা হলো, সরকারী দল মুখে বলতো তারা সংবিধান অনুযায়ী সকলকে নিয়েই নির্বাচন করতে চায়। সকাল বিকাল দুপুর তারা সংবিধান সংবিধান জপ করতো। আর একই সাথে একদিকে যেমন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধানকে সঙবিধানে পরিণত করেছিল অপরদিকে বিএনপি সহ বিরোধী দল যাতে ঘরে থাকতে না পারে, ভোটে দাঁড়াতে না পারে, ভোটে দাঁড়ালেও যাতে পোলিং এজেন্ট না দিতে পারে, জনসভা না করতে পারে, মিছিল মিটিং করে জনসমর্থন আদায় না করতে পারে তার জন্যে পুলিশ লেলিয়ে দিত, হেলমেটবাহিনী নামিয়ে দিত, এমনকি আমলাতন্ত্র ব্যবহার করে নানা অজুহাত দেখিয়ে প্রার্থীতাও বাতিল করে দিত। আর বিএনপির লক্ষ লক্ষ কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে ঘর ছাড়া করে রাখতো।
ফলে আমরা ২০১৪ সালে বিএনপিসহ অধিকাংশ বিরোধী দলের নির্বাচন বয়কট করতে বাধ্য হতে দেখেছি অন্যদিকে ২০১৮ সালে নির্বাচনে বিএনপির অংশ নিয়ে ঘর হতে বের হতে না পারার দৃশ্যও দেখেছি। এসব ঘটিয়ে তৎকালীন সরকার তথাকথিত সঙ-বিধান সম্মত নির্বাচন করতে পারলেও জনগণ সেটা ঘৃণাভরে মনে মনে প্রত্যাখান করেছিল। একথা সত্য দুর্নীতির অভিযোগ সত্তেও তৎকালীন সরকার দেশের যে উন্নয়ন করেছে তা আর কেউ করতে পারে নি।
কিন্তু তারপরও অধিকাংশ মানুষ তাদেরকে মনে মনে প্রচন্ড ঘৃণা করতে শুরু করেছিল। তাই বলে বিএনপির ডাকেও সর্বস্তরের জনগণ কখনই সরকারকে ফেলে দিতে মাঠে নামে নি। পনের ষোল বছর বিএনপি বহুবার গণঅভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছে, বিশাল বিশাল কর্মসূচি পালন করেছে, জনসমাগম ঘটাতে পেরেছে কিন্তু গণঅভ্যুত্থান ঘটানোর মত সর্বস্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারে নি। আওয়ামী লীগ এটা বুঝতে পেরেছিল বলেই তারা বিএনপির ঈদের আগের বা পরের ঘোষিত কোন আন্দোলনেই খুব বেশী চিন্তিত ছিল না।
আওয়ামী লীগ তথা চৌদ্দদলীয় সরকারকে চিন্তিত হতে দেখেছি ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের মতিঝিল শাপলার মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নিরাপদ সড়ক ও কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত পরে লিখবো। তবে এটাই হলো সত্য কথা যে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দেশের সাধারণ ও সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল বলেই সরকারের প্রতি শক্তিশালী প্রতিবেশীর সমর্থন থাকা সত্তেও, দেশের সকল বাহিনীর বলিষ্ঠ আনুগত্য, আমলাদের বড় অংশ ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দল থাকা সত্ত্বেও তাদের পতন হয়েছে।
এই যে দেশের সর্বস্তরের মানুষ নেমে এসেছিল তার কারণ, আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল নিরপেক্ষ ইয়াং ব্লাড তথা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে একটি নুতন সংগঠনের ব্যানার। সেই সময় দমন পীড়নের ভয়ে প্রকাশ্যে বিএনপি অস্বীকার করলেও ঐ সংগঠনের পেছনে বিএনপি সহ সকল দল মতের সমর্থন ছিল। ছেলে মেয়েরা একসাথে সাহস দেখিয়েছে, বুক পেতে গুলি নির্যাতন সহ্য করেছে, সরকারের পতন হয়েছে। মানুষ আশা করেছে এবার দেশে আর কোন বৈষম্য থাকবে না। সবাইকে নিয়ে দেশ গড়ে তোলা হবে। অবাধ নিরপেক্ষ ও ইনক্লুসিভ নির্বাচন থেকে আর যেন কোন দানবীয় শক্তি জনগণকে বঞ্চিত করতে না পারে সেজন্যে সবার আগে রাষ্ট্র সংস্কার চেয়েছে।
মানুষ চেয়েছে শুধু অপরাধীদের বিচার হবে, রাজনৈতিক বিশ্বাস নির্বিশেষে নিরাপরাধ মানুষকে কখনোই হয়রানী করা হবে না। আগের সরকারের মত রাজাকার ট্যাগ দিয়ে, বিএনপি জামাত বিএনপি জামাত জপ করে কাউকে তার সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে না। নির্বাচন থেকে পরিকল্পিতভাবে দুরে রাখতে হামলা, মামলা ট্যাগিং করে আর কোন একতরফা নির্বাচন দেশে হবে না।
কিন্তু আফসোস, এখন দেশে যা দেখা যাচ্ছে, আবারও দেশে সেই ফ্যাসিবাদের পরিকল্পিত ফুট প্রিন্ট অনুসরণ করার লক্ষণ সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিগত সরকারের আমলে গড়ে উঠা একটি ক্ষুদে রাজনৈতিক দল এবং গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী জনআকাংখার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা একটি নুতন প্রতিশ্রুতিশীল রাজনৈতিক দল ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে।
তাদের উপদেষ্টারা সম্ভবত পরামর্শ দিয়েছে বিএনপি জামাত জোটের বিরোধী যে চৌদ্দ দল বা মহাজোট দেশের একটা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সমর্থন লাভ করে এসেছে দীর্ঘদিন, তাদেরকে ঢালাওভাবে ফ্যাসিষ্ট আখ্যা দিয়ে বল প্রয়োগ করে আগের সেই একই ফ্যাসিবাদি কায়দায় আগামী নির্বাচন থেকে দুরে রাখতে পারলে তারা ফায়দা নিতে সক্ষম হবে।
অর্থাৎ সেই একই স্টাইল, আগে যেমন রাজাকার রাজাকার বলে মানুষকে বিভাজন করে রাখা হতো, ডিভাইড এন্ড রুল নীতি চালু করা হয়েছিল, এখন ফ্যাসিবাদ ফ্যাসিবাদের দোসর ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে ডিভাইড এন্ড রুল নীতির সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এই নীতিতে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার তিনবার সফল হলেও ছয়বারের মত পিছিয়ে গেছে। নুতন করে যারা এসব বিভাজনের রাজনীতি দেশে চালু করতে চাইছে তারা দু একবার হয়তো সফল হবে কিম্তু পিছিয়ে পড়বে বহু বছরের জন্যে, হয়তো এক সময় অস্তিত্বও থাকবে না।
অথচ তাদের রয়েছে যথেষ্ট প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ নেতৃত্ব। পরিবারতন্ত্রের বাইরে দেশের একটা বড় অংশের জনগণ তাদের প্রতি আস্হা রাখতে চায়। কিন্তু মব লিন্চিং কোন দেশকেই এগিয়ে নিতে পারে না। মবলিন্চিং একটা দেশকে গৃহযুদ্ধের মত পরিস্হিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। আর সকল প্রকার সংস্কারকে করে তুলতে পারে অর্থহীন। মানুষ যদি ফ্যাসিস্ট আমলের মতই স্বাধীনভাবে কথা বলতে না পারে, মত প্রকাশ করতে না পারে, নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে সবকিছুই তাহলে ভুয়া প্রমাণ হবে, ২৪ এর শহীদদের রক্ত এভাবে বৃথা যেতে দেয়া কি ঠিক হবে?
স্কারবোরো, কানাডা

