
সাবেক সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া একটি রায় গতকাল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে বাতিল ঘোষণা করেছেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড থেকে খালাস পান জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম।
গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ ও নির্যাতনের ছয় ঘটনায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায় গতকাল মঙ্গলবার বাতিল করে দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
ছয় বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আজহারের আপিল শুনে এ রায় দেওয়া হয়।
গত বছরের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর আজহারুল মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফা আপিল করেন। প্রথম দফায় ২০১৯ সালে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রেখেছিলেন তৎকালীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ।
আজ তিনি জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু তার মুক্তির পক্ষে বিপক্ষে চলছে তর্ক বিতর্ক, আনন্দ, ক্ষোভ বিক্ষোভ।
পাঠক বিবেচনা করুন, একটি দেশের উচ্চ আদালত একই বিষয়ে দুই দুইবার শুনানি করলেন এবং ভিন্ন রায় দিলেন। ছয় বছর আগে এবং বর্তমান সময়ে পার্থক্যটা কী? পার্থক্য হলো সময়। এই ছয় বছরে সরকার পরিবর্তন ঘটেছে। এটাই মুলকথা। আজ ছয় বছর পরেও যদি সেই আগের সরকার থাকতো, আর জনাব আজহার যদি তৃতীয় কিংবা চতুর্থবারের মতও আপিল করতেন তাহলেও তার মৃত্যুদণ্ডের রায় পরিবর্তন হতো না সেটা অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। অথবা বলা যায়, ছয় বছর আগে যদি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকতো তাহলে হয়তো তিনি ছয় বছর আগেই মুক্তি পেয়ে যেতেন।
অথচ যে সব অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল তা খুবই গুরুতর অভিযোগ। তাহলে বুঝা যায় মামলা যতই গুরতর হোক না কেন, কিংবা মামলা গুরতরভাবে করা হবে কি হবে না, বিদ্যমান ব্যবস্হায় সবই নির্ভর করে ক্ষমতাসীন কে বা কারা আছেন তার উপর।
পাঠক বুঝতে চেষ্টা করুন, সেজন্যই আমাদের রাষ্ট্র সংস্কার দরকার। কারণ সংস্কারের পর যে রাষ্ট্র গঠিত হবে সেই রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তন হলেও বিচারালয়ের রায়ের পরিবর্তন হবে না। সংস্কারকৃত রাষ্ট্রে কোন ভুয়া মামলা কেউ দায়ের করতে সাহস পাবে না। করলেও প্রাথমিক তদন্তেই তা বাতিল হবে এবং অভিযোগকারী শাস্তির আওতায় চলে আসবে। আর যদি মামলা ভুয়া না হয়, নিম্ম আদালত থেকে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গিয়ে রায় বহাল থাকে, তাহলে সেই রায় কোন সরকার পরিবর্তন হলেও কোর্টের রায় পরিবর্তন হবে না। পঞ্চাশ বছর পর হলেও পরিবর্তন হবে না। কেউ যদি সত্যিই মানবতাবিরোধী অপরাধ করে থাকে, একশত বছর পর হলেও সে শাস্তি পাবে।
আমাদের দেশে সেই বিচার বিভাগ, সেই রকম সরকার ব্যবস্হা কি আছে যেই সরকার ব্যবস্হায় আদালতের রায়ের উপর সকল শ্রেণী পেশার মানুষের পূর্ণ আস্হা আছে? কোন রায়ের পরই জনগণের একটা অংশ পলিটিক্যালি মোটিভেটেড বলে রায় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করবে না?
এক কথায় উত্তর হলো নেই, এখন পর্যন্ত নেই। সেই রকম একটা সমাজ ও রাষ্ট্র কায়েম করতে হলে আমাদের স্বাধীন বিচার বিভাগ দরকার। যেই বিচার বিভাগ কোনভাবেই সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে ১৮০ ডিগ্রী টার্ণ করে রায়ের পরিবর্তন হবে না। আপনি আমি দেশের সাধারণ মানুষ কি সেই সংস্কার আশা করলে পাপ হবে?
স্কারবোরো, কানাডা

