
পৃথিবীর বাইরে কি প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে? মহাবিশ্বের অসংখ্য গ্রহের মধ্যে এমন কোনো জগৎ কি আছে, যেখানে প্রাণের বিকাশের পরিবেশ পৃথিবীর চেয়েও অনুকূল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার কথা সামনে এনেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের ধারণা, মহাবিশ্বে এমন কিছু গ্রহ থাকতে পারে, যেগুলো প্রাণের বিকাশ ও টিকে থাকার জন্য পৃথিবীর চেয়েও বেশি উপযোগী।
বিজ্ঞানীদের কাছে এসব সম্ভাব্য গ্রহ ‘সুপারহ্যাবিটেবল’ বা অতিমাত্রায় বাসযোগ্য গ্রহ হিসেবে পরিচিত। এসব গ্রহে অনুকূল জলবায়ু, তরল পানির আধিক্য এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রাণের বিবর্তনের সুযোগ থাকতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
কেমন হতে পারে অতিমাত্রায় বাসযোগ্য গ্রহ?
গবেষকদের ধারণা, এ ধরনের গ্রহ পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি প্রশস্ত এবং প্রায় দ্বিগুণ ভরবিশিষ্ট হতে পারে। অধিক ভরের কারণে এসব গ্রহ ঘন বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে পারে, যা তাপমাত্রা ও জলবায়ুকে তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করতে পারে।
এ ছাড়া বড় লৌহকেন্দ্র থেকে শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হলে তা মহাকাশের ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে গ্রহের পরিবেশকে সুরক্ষা দিতে পারে। বিস্তৃত অগভীর সমুদ্র, হ্রদ ও দ্বীপও এসব গ্রহে প্রাণের বিকাশের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে অগভীর জলরাশি ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য দেখা যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, কোনো গ্রহে এমন পরিবেশ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত থাকলে সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণের বিকাশের সুযোগ বাড়তে পারে।
প্রাণের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ কমলা রঙের নক্ষত্র?
গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ‘কে-ডোয়ার্ফ’ নামে পরিচিত এক ধরনের কমলা রঙের বামন নক্ষত্র। এগুলো সূর্যের তুলনায় ছোট ও শীতল। এসব নক্ষত্র ধীরে ধীরে জ্বালানি খরচ করে বলে দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীলভাবে আলো ও তাপ দিতে পারে।
ফলে এসব নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহে প্রাণের উদ্ভব ও বিবর্তনের জন্য দীর্ঘ সময় পাওয়া যেতে পারে।
জার্মানির লাইবনিজ ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিকসে কর্মরত জ্যোতির্জীববিজ্ঞানী ইভা ভিলোভিচ কমলা রঙের নক্ষত্রের আলোর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন। কৃত্রিমভাবে তৈরি এ ধরনের আলোয় উদ্ভিদ চাষের পরীক্ষায় তিনি উদ্ভিদের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করেন। গবেষণাটি ভিনগ্রহে সালোকসংশ্লেষণ ও প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে।
পৃথিবীর চেয়েও ভালো হতে পারে অন্য কোনো গ্রহ?
২০১৪ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী রেনে হেলার ও জন আর্মস্ট্রং অতিমাত্রায় বাসযোগ্য গ্রহের ধারণা নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে, প্রাণের উপযোগী গ্রহ খোঁজার ক্ষেত্রে শুধু পৃথিবীর মতো গ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়।
পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব বজায় রয়েছে নানা প্রাকৃতিক ভারসাম্যের কারণে। তবে সূর্যের ক্রমবর্ধমান উজ্জ্বলতা ভবিষ্যতে পৃথিবীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫০ কোটি বছর পর পৃথিবী জটিল প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত দীর্ঘজীবী নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা কোনো কোনো গ্রহে প্রাণের বিকাশের অনুকূল পরিবেশ আরও দীর্ঘ সময় স্থায়ী হতে পারে। এতে জটিল ও বৈচিত্র্যময় প্রাণের বিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।
ভিনগ্রহে কি থাকতে পারে অ্যালিয়েন?
অতিমাত্রায় বাসযোগ্য গ্রহে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ থাকার সম্ভাবনা বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। সেখানে উদ্ভিদ, অণুজীব কিংবা আরও জটিল প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে কি না, তা নিয়ে চলছে অনুসন্ধান।
তবে কোনো গ্রহে তরল পানি, উপযুক্ত তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডল থাকলেই সেখানে প্রাণ রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাব্য ইঙ্গিত পেতে বিজ্ঞানীরা গ্রহের বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের উপস্থিতি বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
মহাকাশ অভিযানে নতুন প্রত্যাশা
সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহ শনাক্ত করতে ভবিষ্যতে আরও উন্নত মহাকাশ পর্যবেক্ষণযন্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘প্ল্যাটো’ অভিযান ২০২৭ সালে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।
এ ছাড়া জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্রের সাহায্যে দূরবর্তী কিছু গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে। চিলিতে নির্মাণাধীন এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ এবং ভবিষ্যতে নাসার পরিকল্পিত ‘হ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস অবজারভেটরি’ এ অনুসন্ধানে আরও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহ শনাক্ত করা এবং সেখানে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। এ জন্য দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্বের প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত। অতিমাত্রায় বাসযোগ্য গ্রহের ধারণা সেই অনুসন্ধানে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণা হয়তো একদিন জানাবে, পৃথিবীই প্রাণের একমাত্র আশ্রয়, নাকি মহাবিশ্বের অন্য কোনো দূরবর্তী জগতেও প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে।

