
শর্মা প্রেমীদের কাছে কানাডার রাজধানী অটোয়ার গুরুত্ব আরও এক ধাপ বৃদ্ধি পেল। বিশ্বের দীর্ঘতম শর্মা স্যান্ডউইচ তৈরির নতুন গিনেস বিশ্বরেকর্ড গড়ে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে শহরটি। দ্বিতীয় বার্ষিক অটোয়া শর্মা ফেস্টিভাল উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এই আয়োজন শুধু একটি খাদ্য উৎসবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি পরিণত হয়েছে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, সামাজিক সংহতি এবং মানবিক উদ্যোগের এক অনন্য উদযাপনে। রোববার অটোয়ার ঐতিহাসিক বাইওয়ার্ড মার্কেট এলাকায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল বিশ্বের দীর্ঘতম শর্মা স্যান্ডউইচ তৈরির প্রচেষ্টা। বিশাল একটি টেবিলজুড়ে শত শত শর্মা র্যাপ সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে আয়োজকেরা গিনেস বিশ্বরেকর্ড ভাঙার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন।
এর আগে বিশ্বের দীর্ঘতম শর্মা স্যান্ডউইচের রেকর্ড ছিল কানাডারই অন্টারিও প্রদেশের লন্ডন শহরের দখলে। ২০১৯ সালে সেখানে ২ হাজার ২৮৭টি শর্মা ব্যবহার করে রেকর্ড গড়া হয়েছিল। তবে এবারের উৎসবে সেই রেকর্ডকে অনেকটাই ছাড়িয়ে যায় অটোয়া। শর্মা ফেস্টিভালের উদ্যোক্তা মো মোসালামের নেতৃত্বে আয়োজকেরা ২ হাজার ৪৫১টি শর্মা র্যাপ দিয়ে প্রায় ৩৫০ মিটার দীর্ঘ একটি স্যান্ডউইচের সারি তৈরি করেন। গিনেস কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নিয়ম মেনে রেকর্ডটি যাচাই করা হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ববর্তী রেকর্ড ভেঙে যায়। খাদ্যপ্রেমীদের কাছে এটি ছিল শুধু সংখ্যার খেলা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারের জনপ্রিয়তার এক শক্তিশালী প্রতীক।
উৎসবে কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলের জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ অংশ নেয়। মন্ট্রিয়লের ‘বোস্টান’, টরন্টোর ‘তুত’স ইজিপশিয়ান স্ট্রিট ফুড’ এবং অটোয়ার ‘শর্মা প্যালেস’সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান তাদের বিশেষ শর্মা পরিবেশন করে। বিভিন্ন ধরনের মাংস, সস, মসলা এবং র্যাপের সংমিশ্রণে তৈরি শর্মাগুলো দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। উৎসবের অংশ হিসেবে সাত সদস্যের একটি বিচারক প্যানেল সেরা শর্মা নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে। বিচারকদের মূল্যায়নে প্রথম স্থান অর্জন করে মন্ট্রিয়লভিত্তিক রেস্তোরাঁ ‘বোস্টান’। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বর্তমানে অন্টারিও, কুইবেক, নিউ ব্রান্সউইক, নোভা স্কশিয়া এবং ম্যানিটোবাসহ কানাডার একাধিক প্রদেশে বিস্তৃত। স্থানীয় জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ ‘থ্রি ব্রাদার্স’ দ্বিতীয় এবং ‘শর্মা প্যালেস’ তৃতীয় স্থান অধিকার করে।
শুধু খাবার নয়, উৎসবজুড়ে ছিল সঙ্গীত, বিনোদন এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর জ্যেষ্ঠ পুত্র জ্যাফ ট্রুডো। তিনি অনুষ্ঠানে একাধিক সংগীত পরিবেশন করে দর্শকদের মন জয় করেন। স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনাও উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য বাড়িয়ে তোলে। ফলে শর্মা ফেস্টিভাল ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক উৎসবের রূপ নিতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন আয়োজকেরা।
অটোয়ার সঙ্গে শর্মার সম্পর্ক নতুন নয়। ২০২৪ সালে শহরটির কাউন্সিলররা আনুষ্ঠানিকভাবে অটোয়াকে ‘কানাডার শর্মা রাজধানী’ হিসেবে ঘোষণা করেন। সে সময় কাউন্সিলর লরা ডুডাস জানিয়েছিলেন, শহরটিতে প্রায় ২০০টির মতো শর্মা রেস্তোরাঁ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত অভিবাসীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজব্যবস্থার কারণে অটোয়ায় শর্মা ধীরে ধীরে একটি জনপ্রিয় খাদ্য সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে শহরের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে এই খাবার।
অটোয়ার মেয়র মার্ক সাটক্লিফ এবারের উৎসবের সাফল্যে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, বাইওয়ার্ড মার্কেটে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের শর্মা ফেস্টিভাল ছিল অসাধারণ। ইয়র্ক স্ট্রিটজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ একত্রিত হয়ে সুস্বাদু খাবার ও বিনোদন উপভোগ করেছেন। তার মতে, এ ধরনের আয়োজন অটোয়ার বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করে এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যকেও উৎসাহিত করে।
উৎসবের সবচেয়ে প্রশংসিত দিক ছিল এর সামাজিক দায়বদ্ধতা। রেকর্ড তৈরিতে ব্যবহৃত দুই হাজারেরও বেশি শর্মা পরবর্তীতে স্থানীয় অলাভজনক সংস্থা ‘শেফার্ডস অব গুড হোপ’-এর কাছে দান করা হয়। সংস্থাটি অটোয়ার গৃহহীন ও অসহায় মানুষের জন্য খাদ্য ও আশ্রয় সহায়তা প্রদান করে থাকে। ফলে উৎসবের খাবার অপচয় না হয়ে সরাসরি প্রয়োজনমতো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
অটোয়ার শর্মা ফেস্টিভাল প্রমাণ করেছে যে একটি খাদ্য উৎসব শুধু বিনোদন বা ব্যবসার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরতে, স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙা করতে এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কার্যকর মাধ্যমও হতে পারে। বিশ্বের দীর্ঘতম শর্মা স্যান্ডউইচের নতুন রেকর্ড নিঃসন্দেহে অটোয়ার জন্য গর্বের বিষয়। তবে তার চেয়েও বড় অর্জন হলো একটি বহুজাতিক শহর কীভাবে খাবারকে কেন্দ্র করে মানুষকে একত্র করতে পারে এবং একইসঙ্গে মানবিক সহমর্মিতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি করেছে এই আয়োজন। শর্মা ফেস্টিভালের এবারের সাফল্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী বছরগুলোতে অটোয়া শুধু কানাডার নয়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উৎসবের গন্তব্য হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

