
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েনের প্রভাব ভ্রমণ খাতেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরে কানাডিয়ানদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের হার কমলেও সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় ফিরতি যাত্রার সংখ্যা আবারও বাড়তে শুরু করেছে। ফলে দুই দেশের সীমান্ত অতিক্রমকারী যাত্রীদের আচরণে এক ধরনের নতুন প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার ১১ জুন প্রকাশিত প্রাথমিক উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে প্রায় ১৯ লাখ কানাডিয়ান বাসিন্দা যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরেছেন। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। এর মাধ্যমে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো বার্ষিকভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডিয়ানদের ফিরতি যাত্রা বৃদ্ধি পেল।
এই বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে সড়কপথে যাতায়াত। উপাত্ত বলছে, ব্যক্তিগত গাড়ি বা অন্যান্য অটোমোবাইলে করে কানাডায় ফেরার সংখ্যা এক বছরের ব্যবধানে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী অনেক কানাডিয়ান এখনও স্বল্পমেয়াদি কেনাকাটা, পারিবারিক সফর কিংবা ব্যবসায়িক কারণে যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত করেন। ফলে সড়কপথের এই প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক পরিসংখ্যানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে আকাশপথে ভ্রমণের ক্ষেত্রে। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে বিমানযোগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় ফেরত আসা যাত্রীর সংখ্যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, উচ্চ বিমান ভাড়া, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভ্রমণ ব্যয় বৃদ্ধি এ প্রবণতার পেছনে কাজ করতে পারে।
এর আগে স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা জানিয়েছিল, ২০২৫ সালের শুরু থেকেই কানাডিয়ানদের ভ্রমণ আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার কারণে অনেক কানাডিয়ান যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের বিষয়ে আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছেন।
প্রকৃতপক্ষে, এ পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল আরও আগেই। চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডিয়ান বাসিন্দাদের ফিরতি যাত্রার সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল। সেই সময় এটিকে দুই দেশের ভ্রমণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়েছিল।
এদিকে, ভ্রমণ প্রবণতা নিয়ে ভিন্নধর্মী গবেষণা করেছে ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর স্কুল অব সিটিজ। তারা মোবাইল ফোনের অবস্থানভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, সামগ্রিকভাবে কানাডিয়ানদের আন্তঃসীমান্ত ভ্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গবেষণায় ব্যবহৃত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে কানাডিয়ান ডিভাইস ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে, যা ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়কালকে অন্তর্ভুক্ত করে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে কানাডিয়ানদের আন্তঃসীমান্ত সফর প্রায় ৪২ শতাংশ কমে গেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি প্রধান মেট্রোপলিটন এলাকার মধ্যে কানাডিয়ান পর্যটকদের উপস্থিতি গড়ে ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এটি শুধু পর্যটন শিল্প নয়, সীমান্তবর্তী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, খুচরা বিক্রেতা এবং আতিথেয়তা খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
তবে এই সামগ্রিক পতনের মধ্যেও কয়েকটি শহর ব্যতিক্রম হিসেবে উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ওরেগনের পোর্টল্যান্ড, ফ্লোরিডার গেইন্সভিল এবং ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডে কানাডিয়ানদের ভ্রমণ বরং কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষকরা মনে করছেন, এসব শহরে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসায়িক সুযোগ কিংবা বিশেষ পর্যটন আকর্ষণ বৃদ্ধির কারণেই কানাডিয়ানদের আগ্রহ বেড়ে থাকতে পারে।
সাম্প্রতিক উপাত্ত একটি দ্বিমুখী বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের সামগ্রিক প্রবণতা কমছে, অন্যদিকে যারা ভ্রমণ করছেন তাদের দেশে ফেরার সংখ্যা আবার বাড়ছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং ভ্রমণ ব্যয়ের পরিবর্তন কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত অতিক্রমকারী মানুষের আচরণে আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
পর্যটন ও পরিবহন খাতের পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দুই দেশের মধ্যে ভ্রমণের ধরণ আগের তুলনায় আরও বেশি পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে সড়কপথের ভ্রমণ বৃদ্ধি এবং আকাশপথের যাত্রী হ্রাস ভবিষ্যতের ভ্রমণ বাজার সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।

