
গ্রীষ্মের সকালে প্রায় সবার কপালেই প্রশ্নবোধক ভাঁজের উদয় হয়; গরম কি বেশি পড়বে?
রয়েসয়ে পাতলা রুটি, পাটালি গুড়, চিচিঙ্গা ভাজা দিয়ে নাস্তা সেরে কনডেন্স মিল্কের চায়ে আয়েশ করে চুমুক দিয়ে টাটকা খবরের কাগজের লম্বা ঘ্রাণ নিয়ে মিনিট পনেরো দ্রুত চোখ বুলিয়ে পায়ে স্যান্ডেল, গায়ে পাতলা গেঞ্জি গায়ে বাজারের ব্যাগ হাতে ব্যাটারিচালিত অটোতে উঠলে দেখা যায় প্রায় সবারই গন্তব্যেই এক।
নতুন ঋতু মানেই নতুন সব্জি, নতুন মাছ।
কচুর লতি, নরম ডাঁটা, সজনে ডাটা, লাউ দেখে মন উল্লসিত হয়ে ভাবতে শুরু করে; কী দিয়ে রান্না করা যায়? চিংড়ি, ডালের বড়ি নাকি শুটকি? সাথে মুচমুচে পুঁটি/মেনি মাছ ভাজা, মলা-ঢেলা মাছ বেটে বড়া? মশুর না মাসকালাই ডাল?
অনেকটা শাড়ির সাথে ম্যাচ করে স্কার্ফ পরবার মতো।
কেউ আবার স্বপ্ন দেখে হাঁসের ডিম ভুনার। লালচে কুসুম ভেঙ্গে ডালের সাথে মিশলে মন্দ হতো না। উপচে পড়া ডালে নিমজ্জিত কড়কড়ে আলু ভাজা, কুঁচো চিংড়ীগুলোকে ধরতে জাল ফেলে তুলে আনতে হয়।
এ সময় শরীরে প্রচুর পানি দরকার। ঝোল মানেই গরমের পথ্য।
কেউ আবার মাংসের দোকানের আশপাশে ঘোরাঘুরি করে গরুর চকচকে গোলাপি মাংসের খাঁজে সাদা পাতলা চর্বির আভা দেখে সাহস করে কিনেই ফেলবে কেজিখানেক। প্রচুর ঝাল মরিচের গুঁড়া, গরম মশলা, আদা, আলু দিয়ে তৈরি হবে চুবানো ঝোলের গল্প। সাথে ম্যাচ করে কলমী শাক বা ডুমুর ভাজা। ঝালে মুখের আশপাশ যতো জ্বলবে, ততো সুখ।
তবে মুরগীর তুলনা সে নিজেই।
কাঁচা পেঁপে, আলুর আগুন গরম পাতলা ঝোল ভাতে পড়া মানে স্বাদের ভান্ডার। সাথে একটু লাল শাক বা লাউ ভাজি। ঝোল সমেত মুরগীর গলা-গীলা চিবানোর মতো সুখকর কিছু ইহজগতে আর নেই।
.
মাছের বাজার তো না, যেন জাদুঘর। কেনার চাইতেও দেখতে লাগে বেশ। কেউ হেঁটে বেড়ায় শুধু দেখতে।
রুই-কাতলা-মৃগেল থেকে রেহাই পেতে কেউ কিনবে ট্যাংড়া, কালবাউশের পোনা, বাঁশপাতা, কাজলী, পাবদা, বাটা কিংবা পাঁচমিশালি মাছ। আড্ডায় চুটকীর মতো; ছোটখাটো মজা না হলে জমে না। এগুলোর সাথে ম্যাচ করে আবার খুঁজবে ধনেপাতা, বেগুন, টমেটো। কেউ টাকি মাছের দিকে চেয়ে স্বপ্ন দেখবে ঝাঁঝালো দেশি রসুন আর ধনে পাতা দিয়ে ভর্তা করবার। ম্যাচ করে বেগুন পোড়াবে, ঢেঁড়স সেদ্ধ করে ভর্তা।
.
বাজারের আকর্ষণীয় অংশের দেখা মেলে একদম বর্ডারে, কিনারে, রেললাইনের ধারে বসা হতদরিদ্র চাচা-চাচীদের কাছে। ছোট্ট এক আঁটি পুদিনা, এক আঁটি সর্ষে ফুল, কলার মোচা, মিষ্টিকুমড়ার ফুল, কাগজি লেবু কিংবা বোম্বাই মরিচ। কিংবা কয়েকটা বিচি কলা, আতা, কামরাঙ্গা, আমলকী, চালতা। পরেরদিন আবার হয়তো গাছ আলু, সবেদা, ওল, শাপলা লতা, আদরের হাঁস মুরগীগুলোর পারা মোটে ক’টা অর্গানিক সুস্বাদু ডিম।
ভালো জিনিস অল্পই ভালো।
বাজারের লোকজন এদের প্রতি তেমন সদয় না হলেও তারা ঠিকই ভালবাসা দেখাতে এক পায়ে খাড়া। কাউকে হতাশ করে না, অল্প দামেই দিয়ে দেয়।
.
ভাগ্যক্রমে রেইলগেট বন্ধ।
দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল ভেসে আসে।
হাজারো রিকশা, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, অটো’র জ্যাম বেধে যায়। কিছু বেয়াদব মাথা ঝুকে লোহার ব্যারিয়ারের তলা দিয়ে রেললাইন পার হতে থাকে।
কমপক্ষে দশ মিনিটের মামলা। এ সুযোগে জাহাঙ্গীর হোটেল থেকে গোটা দশেক আগুন গরম সিংগাড়া কিনে নেট ব্যাগে ঝুলিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। ট্রেন হাজারবার দেখলেও মন ভরে না। শেষ বিন্দু মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত চোখ আটকে থাকে। গেট খুলে দিতেই পিঁপড়ার মতো কে কার আগে যাবে সেই প্রতিযোগীতায় ব্যস্ত। টুংটাং বেলের ঝলকানি।
গরম জেঁকে বসতে থাকবে।
সদাইগুলো ভালোমতো আকড়ে ধরে রেললাইনের ঝাঁকি পেরিয়ে আবার চলা শুরু। রিকশার গতি বাড়তেই বাতাসে সারা শরীর জুড়িয়ে যায়। ঘাম শুকিয়ে স্বস্তি এনে দেয়।
আহা, পথটা শেষ না হলে ভালোই হতো..
অটোয়া, কানাডা

