উড়াল

উড়াল - the Bengali Times
ওটা ছিল শেষ দৃশ্য

পাখিটি শেষবারের মত উড়ে গেল আস্তাবল ছেড়ে।

ওটা ছিল শেষ দৃশ্য। মাঝখানের চিত্রটি এরকম, এক দিনমজুর প্রতিদিন আস্তাবলে ফিরে আসতো ঘোড়ার ঘাস কেটে। মাঠ থেকে একটি পাখি উড়ে আসত দিনমজুরের মাথার ওপর দিয়ে। তাতেই ছায়া পেত দিনমজুর। ওপর থেকে ছায়া দিতে দিতে একসময় দিনমজুরের প্রেমে পড়ে যায় হলুদিয়া পাখি।

- Advertisement -

দিনের শেষে হামাগুড়ি দিয়ে দিনমজুর আস্তাবলের এ লাইন থেকে সে লাইনে যেত। মোটা ব্রাশ দিয়ে প্রতিটি ঘোড়ার গা ডলে দিত। উঁচু উঁচু ঘোড়াগুলোকে বলতো আরও কিছু লাগবে কি? খাওয়া দাওয়া শেষ হয়ে গেলে বলত, এখন বিশ্রাম নাও সকালে আবার দেখা হবে। ‘গুড নাইট’।

এসব দূর থেকে দেখত পাখিটি। ঘোড়াগুলোর পাশ কেটে দিনমজুরের কাছে যেতে সাহস পেত না। দূর থেকে চেয়ে চেয়ে দেখত দিনমজুরের ঋজু দেহ। ঘামে ভেজা বুক। বৃষ্টির মত নরম চাহনিতে সহজ সরল একটি মুখ। যুবকটির মেদ শূন্য দেহ কোনরকম আটকে রাখতো পরনের ঢিলেঢালা জিন্স। জো’কে ওভাবে খালি গায়ে দেখে পাখিটি মুখ লুকিয়ে লজ্জা পেত আর মনে মনে বলত আমার সাথে কী কোন কথা নেই তোমার? সব কথা ওই ঘোড়াদের সাথে? এমন পাখি বিদ্বেষী দিনমজুর নাকি একটিও দেখেনি হলুদিয়া পাখি।

যাইহোক, একরাতে পাখিটি উড়ে গেল আকাশে। কিছুদিনের জন্য সে মিশে যাবে অন্য পাখিদের মাঝে। যাবে দূর দেশে। হয়তো আসবে ফিরে দু’এক বছর পর। নিজে আসতে না পারলে যার কাছে বলবে দিনমজুরের সাথে তার ভালোবাসার গল্প, সেই পাখিটি হয়তো এসেই খুঁজবে কিংবদন্তী গল্প।

কিন্তু বেশিদিন সে বিদেশে থাকতে পারল না। হলুদিয়া পাখি চলে এল দিনমজুরের টানে। এত দূর থেকে উড়ে এসেও পাখিটি তার প্রিয় মানুষের দেখা পেল না। কারণ, কিছুদিন আগে দিনমজুরকে তারই পোষা ঘোড়া একটি লাথি দিয়েছিল। পায়ের উপর সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার ক্লান্তি দূর করার জন্যই লাথিটি দিয়েছিল বুলেট। বুঝতে পারেনি এতোটা কাছে দাঁড়িয়ে ছিল দিনমজুর। অথবা এমনও হতে পারে হয়তো আশপাশ থেকে মালিকের গন্ধ নাকে আসতেই লাথিটি দিয়েছিল ইচ্ছে করে।

খবর পেয়ে জো’র মালিক ঠিকই এসেছিল দল বল নিয়ে। সাথে ছিল একজন ঘোড়ার ডাক্তার। ডাক্তারকে বলেছিল ওহে ডাক্তার, দিনমজুরের চিকিৎসা তোমাকেই করতে হবে। তবে যাবার আগে আরও একবার ভালো করে সবগুলো ঘোড়া চেক করে যেও। বিশেষ করে বুলেটকে। আগামী সপ্তাহে কিন্তু ওকে দৌড় প্রতিযোগিতায় যেতে হবে। হেরে গেলে বুলেটকে গুলি করে মারবো।

চামড়ার নিচে যেখানে হৃদপিণ্ড থাকে ঠিক সেখানে বুলেটের লাথি লেগেছিল। তারপর থেকে আর দাঁড়াতে পারেনি জো। মাটিতে শুয়ে শুয়ে বুলেটের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়েছিল তিনদিন। কথা বলার শক্তি ছিল না তার। তিনদিন পর আস্তাবলের মেঝেতে শেষ নিঃশ্বাস ফেললো সে।

দিনমজুরের শেষ নিঃশ্বাস গিয়ে পড়লো একটি ঘোড়ার ঘাড়ে। সাথে সাথেই ওরা ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছিল আস্তাবল। কি ভীষণ চিৎকার ওদের। এক ঘোড়া এদিকে ছোটে তো অন্য ঘোড়া অন্যদিকে। শেষমেশ কোন কিছু না করতে পেরে ওদেরই একজন বলেছিল দুঃখিত জো, কিছুই করতে পারলাম না তোমার জন্য। হয়তো মানুষ হলে কিছু একটা করে দেখাতাম। কিন্তু আমরা তো পশু।

এত কিছু হয়ে গেল তবুও বুলেট করেনি কোন চীৎকার। যেদিনের ঘটনা, সেদিন থেকে সে সম্পূর্ণ নির্বাক। জো’র আদর বুলেটই পেত সবচেয়ে বেশি অথচ আজ সে ভুলে গেছে কী করে দিতে হয় চিৎকার।

হলুদিয়া পাখি এসবের কিছুই জানতো না। ঘুরতে ঘুরতে সে চলে গিয়েছিল সাইবেরিয়া। ভালোবাসার টানে ফিরে এলেও দিনমজুরের দেখা পেল না কোথাও। জো জো বলে অনেক ডেকেছিল কিন্তু কেউ সাড়া দিল না তার কিচিরমিচির ডাকে। কয়েকটি দিন এভাবেই কেটে গেল। একা একা মাঠে গিয়ে বসে থাকত আবার একাই ফিরে আসতো আস্তাবলে, আবার যেত শস্যখেতে।

একদিন গভীর রাতে বুলেট বের হয়ে এল আস্তাবল থেকে। কোথায় যাবে কে জানে? রহস্য দেখার জন্য পাখিটি বুলেটকে অনুসরণ করে এক মাইল দূরের গোরস্থানে গিয়ে পৌঁছল। এতসব বুঝবে কী করে পাখি। মাটির নিচে কী হয় না হয় সে গল্প তাকে কেউ বলেনি। মাটির নিচে যাকে রাখা হয় তার নামের ফলক থাকে ঢিবি করা মাটির ওপর। পাখিটি জো’র নাম দেখতে পেল। সে বুঝতে পারে না মাটির নিচে দিনমজুর কি করে হাঁটছে। মাটির নিচে কী করে ঘামে তার শরীর। কি করে বলে ‘গুড নাইট’?

গভীর রাতে নীল আকাশের নিচে সাত পাক খেল একটি পাখি। এতরাতে সচরাচর পাখিদের কোথাও উড়তে দেখা যায় না। তবুও হলুদিয়া পাখীর নিচে নেমে আসার কোন লক্ষণ নেই। মনে হয় মাটির বন্ধন ছিন্ন করে সে উড়ে চলছে। যত দূর যেতে পারে ততোই লাভ।

আগামীকাল জো’র মালিকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিন। এবার প্রতিযোগিতা হবে বিশেষ এক সওদাগরের ঘোড়ার সাথে। তার ঘোড়াকে অনেক টাকার খাবার খাওয়ানো হয়। এক ঘোড়ার পেছনে তিনজন মানুষ কাজ করে। অথচ জো’র মালিক আস্থা নিয়ে বসে আছে বুলেটই পারবে সওদাগরের ঘোড়াকে হারাতে।

অনেকক্ষণ মুখ উঁচু করে ছিল বুলেট। তার চোখ ভরা পানি। হলুদিয়া পাখি অদৃশ্য হতেই ডান পায়ের খুর দিয়ে মাটির ঢিবিতে আঘাত করতে করতে বলতে থাকে ঘোড়াদের ভাষা। মালিক বন্দুক পরিষ্কার করে গুলি ভরছে এমন দৃশ্য বুলেট নিজ চোখে দেখে এসেছে। সাধারণত ঘোড়াদের গুলি মারা হয় মাথার ঠিক মধ্যখানে। এ নিয়ে অবশ্য বুলেটের কোন মাথা ব্যথা নেই। রেসের ঘোড়া যখন একদিন গুলি খেতেই হবে তাকে। কিন্তু বুলেটের মন খারাপ অন্য কারণে। সে ভেবে পায় না কে বানিয়েছে এমন এক নিয়ম, যার কারণে জো’র পাশে সে কোনদিন যায়গা পাবে না।

এক ঘোড়ার ভাষা অন্য ঘোড়া বুঝতে পারে কিনা সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থাকতে পারে। কাজেই বুলেটের এই বুক ফাটা চিৎকার কে বুঝবে কে জানে। তবুও মনে হলো কোথায় যেন বুলেটের নিঃশব্দ উচ্চারণ দিয়ে একটি সমীকরণ টানা যায়। হয়তো ওসবের একটাই মানে, গুড নাইট।

স্কারবোরো, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles