বুক উজাড় করে যে বিদেশী শব্দকে গ্রহণ করেছে

বুক উজাড় করে যে বিদেশী শব্দকে গ্রহণ করেছে - the Bengali Times
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হবার পর থেকে আমরা বেশি করে জানতে পারলাম পৃথিবীর সব ভাষার সম মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করার জন্য এখন একটি আন্দোলন চলছে

বাংলা ভাষা নিয়ে এখন কিছু কিছু লোকের মধ্যে একটা ভয় ও ভীতি কাজ করছে। আরবি ফার্সি ইংরেজি হিন্দি ভাষা থেকে নতুন নতুন শব্দ গ্রহণ করতে না পারলে বাংলা ভাষা দুর্বল হয়ে যাবে এমনটাই তারা মনে করেন। এ কথা সত্য যে বিদেশী শব্দের অনুপ্রবেশের প্রতি লাল পতাকা দেখালে একটি ভাষা পুষ্ট হয় না। ইংরেজি ভাষা সর্বাধিক প্রচলিত হবার অন্যতম কারণ এই ভাষা সবচাইতে বেশি বিদেশী শব্দ গ্রহণ করেছে। আবার পৃথিবীর অনেক ভাষা তাদের ঘরে খিল এঁটে দিয়েছে যাতে বিদেশী ভাষা প্রবেশ করতে না পারে। অন্যদিকে পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গেছে অনেক আদি ভাষা। সেগুলোর ব্যবহার না করার ফলে আজ সম্পূর্ণ লুপ্ত।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হবার পর থেকে আমরা বেশি করে জানতে পারলাম পৃথিবীর সব ভাষার সম মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করার জন্য এখন একটি আন্দোলন চলছে। ভাষাতে ভাষাতে বৈরিতা নয় বরং অন্য ভাষার আধিপত্য ও দখলদারিত্ব ঠেকাতে অতিরিক্ত সচেতনতার কথা বলা হচ্ছে। বলা যেতে পারে ভাষার শোষণ মুক্তির আন্দোলন চলছে দেশে দেশে। মোটা দাগে এখন নিজ ভাষায় কথা বলতে উৎসাহিত করা হচ্ছে অধিক মাত্রায়।

- Advertisement -

এযাবৎ কাল বাংলা ভাষা হলো পৃথিবীর সেই সমস্ত ভাষাগুলোর অন্যতম, বুক উজাড় করে যে বিদেশী শব্দকে গ্রহণ করেছে। বলা হয়ে থাকে বাংলা ভাষাতে শুধুমাত্র ফারসি-আরবি শব্দ রয়েছে ৩.৩০ শতাংশ (প্রায় ২,০০০ শব্দ)।

যুগে যুগে বিদেশী শব্দ বা ধ্বনি কখনো অপরিবর্তিত থেকে, কখনো কিছুটা ভেঙ্গে আবার কিছুটা গলে গিয়ে বাংলা ভাষার অংশ হয়ে গেছে। কারো কারো মতে এক লক্ষ পঁচিশ হাজার শব্দ রয়েছে বাংলা অভিধানে তবে সাধারণ বাংলা অভিধানে সম্ভবত ৭৫০০০ শব্দ তালিকা পাওয়া যাবে। তারমধ্যে ৫০ হাজারের অধিক অবিকল বিদেশী শব্দ। যেমন মারাঠি, ওড়িয়া, হিন্দি, পাঞ্জাবি, গুজরাটি, মালায়্যালম, তেলেগু, তামিল, ফরাসি, ইংরেজি, ফার্সি, ইটালিয়ান, গ্রীক, নেদারল্যান্ডস, চীনা, মায়ানমার, জাপানি, এ ছাড়াও আদিবাসী, ধর্মসংক্রান্ত (বৌদ্ধ, ইসলাম, হিন্দু, খৃষ্টান), শাসক বা দাপ্তরিক, কারিগরি ও বিজ্ঞানভিত্তিক শব্দ ইত্যাদি ইত্যাদি জায়গা করে নিয়েছে বাংলা ভাষায়। বাংলা ভাষাতে উজানভাটি কিংবা পলি মাটির ভাষা যেমন, খোকা খুকি চাল চুলা চিংড়ি ঝিনুক ইত্যাদি খুবই কম।

যাইহোক, ঋনশব্ধ, পুনঃঋণশব্দ এবং আমাদের নিজস্ব শব্দ সংযোগে বাংলা ভাষা এখন সংখ্যার বিচারে পৃথিবীর সপ্তম ভাষা। এ স্বত্বেও এখনো নতুন নতুন বিদেশী শব্দ অনুপ্রবেশ করছে। ফেসবুক, সেলফোন, মোবাইল. লাইক এর মত ইংরেজি শব্দ হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে গেছে। ভবিষ্যৎ সময়েও এগুলোর আবির্ভাব চলতেই থাকবে।

কথা হলো এখন সময় এসেছে আমরা যেন প্রতিষ্ঠিত বাংলা শব্দের সাথে সাথে অধিক মাত্রায় সমার্থক শব্দ বা পরিভাষাকে উৎসাহ দেই। সেগুলো নিত্যদিন ব্যবহার করা হবে উত্তম কাজ। ভাষা নিয়ে কাজ করতে ব্যস্ত এরকম ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দিনরাত এ ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। ঠিক এমন সময় কেউ যদি ভিন্ন ভাষার শব্দের পরিবর্তে সম্পূর্ণ বাক্য বা সম্পূর্ণ অভিব্যক্তি তথা মত প্রকাশ ভঙ্গি পরিকল্পনা ও প্রকল্প আকারে বাংলা কথোপকথনে ঢুকিয়ে দিতে চায় তখন একটু সাবধান হওয়া উচিৎ। সম্ভবত আমাদের ভাষার ৬০% এর বেশি শব্দ বিদেশী। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে তো প্রশ্ন করা যেতেই পারে ব্যবহারিক দিক দিয়ে সপ্তম স্থানে থাকা স্বত্বেও বাংলা ভাষা পৃথিবীর কোন ভাষার মধ্যে অনুপ্রবেশ করছে না কেন? বিদেশী শব্দ যদি শব্দ ভাণ্ডারকে হৃষ্ট করে তাহলে আমাদের অবদান একদম শূন্যের কোঠায় কেন?

আফ্রিকার দুএকটি দেশের শান্তি স্থিতিশীল রাখার কাজে আমাদের সামরিক বাহিনী সেখানে দীর্ঘ দিন যাবত উপস্থিত আছে। সেই কারণে স্থানীয় অধিবাসীরা বাংলা শিখতে আগ্রহী হয়েছে কিন্তু তাই বলে তাঁদের ভাষাতে আমাদের শব্দ ভাণ্ডার রাজত্ব করছে এমন কথা আমার জানা নেই। পরিণত-স্তর বলে একটা কথা আছে। এমন স্তরে পৌঁছে গেলে কিছু কিছু জিনিস বর্জন করতে হয়। আমার মতে আমাদের ভাষা এখন নিজে নিজেই হাঁটতে পারে। এখন অন্য ভাষাকে অতিমাত্রায় ঠাই দিলে দেখা যাবে সেই ঠাই দেওয়া রূপ দখলের রূপ নিয়ে বসেছে। ইউনেস্কোর হিসেব মতে, বর্তমানে বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ভাষার সংখ্যা ২,৪০০ উপরে। এর মধ্যে মারাত্মকভাবে বিপন্ন হতে পারে তাঁদের সংখ্যা ছয়শর কাছাকাছি। কথায় বলে, রাজার গোলা শেষ হতে সময় লাগে না। বর্তমানে সপ্তম স্থানে আছি দেখে পাহারা দিব না এমন বোকামি করা ঠিক হবে না।

যে সমস্ত ভাষা নিজের প্রবেশ গেট বন্ধ করে রেখেছে অর্থাৎ পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে তাদের শব্দ ভাণ্ডারে বিদেশী শব্দ খুবই কম অথবা বহু যুগ ধরে তারা একই শব্দভাণ্ডার নিয়ে বসে আছে এমন ভাষার দিক থেকে যদি আমাদের ভাষার উপর চাপ আসে তাহলে বলবো সময় থাকতেই ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলায় কথা বললে শুধুই বাংলা বলব। তেমনি ইংরেজি বললে শুধুই ইংরেজি কিংবা আরবি ফার্সি। মনে রাখতে হবে ঘরের মধ্যে দরজা থাকে ঘরে প্রবেশ এবং ঘরের বাইরে যাবার জন্য। শুধু প্রবেশ হতে থাকলেই দখল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

পরিশেষে বলতে চাই দেশান্তরের কারণে একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মুখ থেকে বাংলাভাষা এমনিতেই হারিয়ে যাচ্ছে। প্রবাসীদের প্রথম জেনারেশন বাংলা লিখতে পড়তে ভুলে যাচ্ছে। দ্বিতীয় জেনারেশন কিংবা তৃতীয় জেনারেশনে গিয়ে সেটা সম্পূর্ণ হারিয়ে যাবে। তার বিপরীতে গুটি কয়েক বিদেশী এনজিও কর্মী বাংলা শিখছে। সমতার অভাব খুবই স্পষ্ট। সাহিত্য শিল্প কলা খাদ্য বা পণ্যের নাম যদি শক্ত অবস্থানে থাকে তাতে কিছুটা লাভ হবার সম্ভাবনা আছে। যেমন তন্দুরি সমুসা শাড়ি গুরু ভাঙড়া এই সমস্ত ভারতীয় শব্দ এখন বিদেশীদের অভিধানে ঠুকে গেছে। মক্কা ও মদিনা শহরের নামে বিশ্বে অনেক শহরের নামকরণ করা হয়েছে। আমেরিকার সাতটি শহরের নাম হচ্ছে মক্কা। এমনি ভাবে ব্রাজিল, মেক্সিকো পেরু এসব নামেও আমেরিকার বিভিন্ন শহরের নাম করণ করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে ঢাকা আমি এখন পর্যন্ত শুনিনি। দেওয়া নেওয়ার এই যুগে কিংবা গ্লোবাল ওয়ার্ল্ডে ভাষার ভাণ্ডারে এখনো যদি দান নিতে হয় তবে বলবো সেই দানকে বদলিয়ে ঋণে রূপ দিতে হবে। যে ঋণ দেবে তাকেও পরিশোধ গ্রহণ করতে হবে।

স্কারবোরো, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles