
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাইবার হামলাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা করে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সরকারি নেটওয়ার্কগুলোকে সতর্ক থাকতে বলেছে দেশটির ডিজিটাল গোয়েন্দা সংস্থা।
কানাডিয়ান সেন্টার ফর সাইবার সিকিউরিটি সম্প্রতি প্রকাশিত এক বুলেটিনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানের প্রতি কানাডার প্রকাশ্য সমর্থনের কারণে দেশটি সাইবার হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে ইরানপন্থী হ্যাক্টিভিস্ট গোষ্ঠীগুলো কানাডার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং সরকারি নেটওয়ার্ককে টার্গেট করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। এর জবাবে ইরান ইতোমধ্যে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। যদিও ভৌগোলিকভাবে কানাডা ইরানের অস্ত্রের সরাসরি আওতার বাইরে, তবে রাষ্ট্রসমর্থিত সাইবার হামলার ঝুঁকি থেকে দেশটি মুক্ত নয়।
২ মার্চ প্রকাশিত বুলেটিনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কানাডার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা (এনার্জি গ্রিড), পানি ও জ্বালানি খাতের অবকাঠামো এবং বিভিন্ন সরকারি নেটওয়ার্ক থাকতে পারে। এসব খাত সাধারণত জাতীয় নিরাপত্তা ও জনজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেগুলোকে বিশেষভাবে সুরক্ষিত রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া শুধু অবকাঠামো নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়েও হুমকি থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা, রাজনৈতিক কর্মী এবং প্রবাসী ইরানি সম্প্রদায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি বা লক্ষ্যভিত্তিক সাইবার কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে। বিশেষ করে যারা ইরানের বর্তমান সরকারের সমালোচক বা সরকার পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান প্রকাশ করেছেন, তাদের ওপর নজরদারি বা সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বুলেটিনে বলা হয়েছে, ইরান-সমর্থিত সাইবার হুমকিদাতারা সাধারণত দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে এমন নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট-সংযুক্ত ডিভাইসকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। অনেক ক্ষেত্রে শিল্প অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা কিংবা জ্বালানি খাতের ডিজিটাল নেটওয়ার্ককে আক্রমণের জন্য বেছে নেওয়া হয়। এ ধরনের আক্রমণ সফল হলে শুধু তথ্য চুরি নয়, বাস্তব অবকাঠামোর কার্যক্রমেও ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাইবার যুদ্ধ আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হয়ে উঠেছে। সরাসরি সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে অনেক দেশই প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বা তথ্যব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে সাইবার আক্রমণ চালিয়ে থাকে। এতে তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে বড় ধরনের ক্ষতি সাধন করা সম্ভব হয়।
কানাডিয়ান সেন্টার ফর সাইবার সিকিউরিটি মূলত কানাডার ফেডারেল গোয়েন্দা সংস্থা কমিউনিকেশন্স সিকিউরিটি এস্টাবলিশমেন্টের অংশ। সংস্থাটি দেশের সাইবার নিরাপত্তা, বিদেশি সিগন্যাল গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ডিজিটাল সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কানাডার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে তাদের সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত সিস্টেম আপডেট, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং সন্দেহজনক অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা যদি আরও বৃদ্ধি পায়, তবে এর প্রতিক্রিয়া শুধু আঞ্চলিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সাইবার যুদ্ধের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে এর প্রভাবের মুখে পড়তে পারে। তাই বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

