
কোন দুঃখজনক কাজ অথবা সেই কাজের সাথে সংশ্লিষ্টতা নিয়ে যখন কেউ ভুল স্বীকার করে ঘটনাটি খুলে বলে, এই পদ্ধতিকে কনফেসন বলা হয়। কনফেসন পক্ষান্তরে এক ধরনের ক্ষমা চাওয়া বা অনুশোচনা বোধ থেকে মুক্তি লাভের আশা করা।
সাধারণত: গির্জায় গিয়ে অপরাধী একটি বেঞ্চের ওপর বসে কথা বলতে থাকে এবং অন্যদিকে ধর্মযাজক বা ফাদার মনোযোগ দিয়ে তার কথাগুলো শুনে হয় উপদেশ দেন, না হয় অপরাধীর পাপ মুক্তির জন্য দোয়া করেন। এদের দুজনের মধ্যে কেউ কাউকে দেখতে পায় না এবং তাদের মধ্যে একটি অস্বচ্ছ আড়াল থাকে। পুরানো পদ্ধতিতে ধর্মযাজকের কোলে মাথা রেখে কিংবা ডাকযোগে চিঠি লিখে মানুষ কনফেস করতো। পরবর্তীতে এই কাজে টেলিফোন ব্যবস্থাও চালু হয়। আজ আমি ফেসবুকের মাধ্যমে একটি স্বীকারোক্তি করবো।
১৯৭২ সালের ঘটনা। তখন নিজেকে মনে হতো মাটি নয়, পৃথিবীকে পায়ের নিচে রেখে এগিয়ে যাওয়া যুবকদের আমিও একজন। তাছাড়া সমাজটাও কিছুটা বিপথে নেমে যাচ্ছিল, অবজ্ঞার ছাড়পত্র থাকতো যুবকদের পকেটে – মগজে। মাত্র কিছুদিন আগে দেশ স্বাধীন হয়েছে। এস এস সি পাশ করে কলেজে যাব যাব করছিলাম। থাকতাম জিগাতলার ৭২/২ নম্বর বাসাতে। অন্য যুবকদের মত আমারও মনে হতো দুনিয়াটাকে যখন তখন হাতের মুঠোয় নিয়ে নিতে পারি। এমনি সময়ে একদিন নিউমার্কেট থেকে রিক্সা নিয়ে বাসার সামনে এসে নামলাম। পকেট থেকে টাকা বের করে রিকশাওয়ালাকে ভাড়া দিলাম। রিকশাওয়ালা ভাড়া না নিয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকলো। আমি বললাম, কী হলো টাকা নিচ্ছ না কেন? তার প্রতিবাদ, ‘এইটা ঠিক ভাড়া না, ঠিক ভাড়া দেন’। আমি বললাম ‘যা দিছি নিলে নাও না নিলে ভাগো’।
ঠিক মনে করতে পারছি না এর উত্তরে সে কী বলেছিল। তবে কথাটা আমার মিথ্যে অহমিকায় আঘাত দিয়েছিল। সাথে সাথে বলে উঠলাম; ‘এক থাপ্পড় দিয়ে মাটিতে ফেলে দিব’।
সে বলল, ‘আমি আপনার আব্বাকে বলে দিব’।
কী কী বললি, আব্বাকে বলে দিবি মানে?
এদিকে মনে মনে ভাবতে লাগলাম আব্বাকে তো অনেকেই চেনে এই রিকশাওয়ালাও নিশ্চয়ই আব্বার কথা শুনেছে। সত্যি বলতে কী আমার কণ্ঠস্বর তখন ভেজা বিড়ালের মত হয়ে গিয়েছিল। নিজেকে সংযত করে বললাম ‘তুমি আব্বাকে চেন’?
সে উত্তর দিল; ‘হা চিনি তুমি শওকত সাহেবের ছেলে না? তোমার নাম বাবলু না’?
আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম । শুধু আব্বাকে না আমাকেও চেনে। কৌতূহল আর সহ্য হচ্ছে না। জিজ্ঞেস করে বসলাম। ‘আমাকে কি করে চেন’?
ও বলল ‘চিনব না কেন, তুমি আমি একসাথে স্কুলে পড়তাম। আমার নাম…’
আমি সাথে সাথে তাকে বুকে জড়িয়ে বললাম বন্ধু ক্ষমা করে দিও। (যদিও তাকে তখনো চিনতে পারি নাই) বললাম ভেতরে এসো, একটু চা খেয়ে যাও।
সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। আমি তার মুখটাও ভালো করে দেখতে পারলাম না। হয়তো ততোক্ষণে ওর চোখে কান্না জমে গেছে। হয়তো নিজকে ঋজু রাখতে শন শন করে চলে যাওয়াকেই উত্তম মনে করেছে। যাবার সময় যেভাবে রিক্সাকে ঘুরিয়ে নিয়ে গেল তাতে মনে হল, যে সমাজে রিকশাওয়ালা হবার কারণে একজন সহপাঠী তাকে থাপ্পড় দিতে চায় সেই অবহেলিত সমাজের দিকে না তাকানই ভাল।
এখনও ভাবি, এত বড় এক পাপ করেছিলাম আমি? সৃষ্টিকর্তা যেন সেই বন্ধুটির নিকট করজোড়ে ক্ষমা চাইবার একটা সুযোগ করে দেন। হয়তো তারও এখন ফেসবুক একাউন্ট আছে, কে জানে। এখন ফেসবুকের চেয়ে বড় কনফেসন বক্স আমি আর দেখি না।
পারলে আপনারাও আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। মনে করবেন, পর্দার আড়াল বেঞ্চে ওপর এখনও নতজানু হয়ে বসে আছি। একদিকে আমি অন্যদিকে আপনি শুনলেন আমার স্বীকারোক্তি।

