
ওয়াশিংটনে সফররত কনজার্ভেটিভ এমপি জামিল জিভানির সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের বৈঠককে ঘিরে কানাডার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে তিনি হোয়াইট হাউস ও পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফলপ্রসূ বৈঠক করেছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাকে একটি বিশেষ বার্তা কানাডিয়ানদের কাছে পৌঁছে দিতে বলেছেন “প্রেসিডেন্ট কানাডিয়ানদের ভালোবাসেন।”
জিভানির এই মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ হলেও, তার সফরের কূটনৈতিক অবস্থান ও উদ্দেশ্য নিয়ে অটোয়ায় কিছুটা সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্য সমঝোতায় প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে সহায়তা করার আগ্রহ প্রকাশের পর রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে সরকারি দায়িত্ব ছাড়াই একজন কনজার্ভেটিভ এমপি কীভাবে এমন আলোচনায় ভূমিকা রাখতে চান?
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জিভানি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক কোনো মন্ত্রী নন এবং কনজার্ভেটিভ দলের বাণিজ্য বিষয়ক ক্রিটিক হিসেবেও দায়িত্বে নেই। তবে কার্নি এটাও জানান, যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লাব্লাঁ তাকে ব্রিফ করেছেন। অর্থাৎ সফরটি পুরোপুরি অনানুষ্ঠানিক নয়, আবার সরাসরি সরকারি প্রতিনিধিত্বও নয় এই মাঝামাঝি অবস্থানই রাজনৈতিক জল্পনার কেন্দ্রে।
জিভানির বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তিনি কেবল একদিনের বৈঠকে থেমে থাকছেন না। এই সপ্তাহে তিনি কয়েকজন মার্কিন সেনেটর, জেনারেল মোটরসসহ বিভিন্ন শিল্প ও নীতিনির্ধারক মহলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে অটো শিল্প নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কের বড় একটি অংশই এই খাতকে ঘিরে।
রাজনৈতিকভাবে আরও একটি দিক গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে জিভানির দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব। মঙ্গলবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় জিভানি বলেন, দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের সেতুবন্ধ গড়ে তুলতেই তিনি কাজ করতে চান। ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কূটনৈতিক যোগাযোগে রূপ দেওয়ার এই প্রয়াস কতটা ফলপ্রসূ হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এ প্রেক্ষাপটে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো বাণিজ্য চুক্তি (সিইউএসএমএ) নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জিভানির মতে, সিইউএসএমএ দুই দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি নিয়ে কনজার্ভেটিভ ও লিবারেলদের মধ্যে অযথা রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডার প্রয়োজন নেই। তার বক্তব্যে এক ধরনের দ্বিদলীয় ঐকমত্যের আহ্বান দেখা গেলেও, বাস্তবে কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিষয়টি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, জিভানির এই সফরকে কয়েকটি স্তরে দেখা যেতে পারে। প্রথমত, এটি হতে পারে অনানুষ্ঠানিক ‘ব্যাক-চ্যানেল’ কূটনীতি যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে নীতিগত আলোচনার পথ খোলা হয়। দ্বিতীয়ত, এটি হতে পারে কনজার্ভেটিভ দলের কৌশলগত অবস্থান শক্ত করার প্রচেষ্টা, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সক্ষমতা প্রদর্শন করা যায়। তৃতীয়ত, এটি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতার অংশ, যেখানে কে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বেশি কার্যকর সে বার্তা ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তবে রাজনৈতিক সৌজন্য ও বাস্তব ক্ষমতার সীমারেখা এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একজন বিরোধী এমপির কূটনৈতিক সক্রিয়তা কতটা রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্পনীতি যেখানে সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত, সেখানে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার পরিধি ও দায়বদ্ধতা নিয়েও বিতর্কের সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে, জিভানির ওয়াশিংটন সফর আপাতত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ভালোবাসার বার্তা’ যেমন প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে, তেমনি আসন্ন বৈঠকগুলো থেকে বাস্তব কোনো অগ্রগতি আসে কি না সেটিই শেষ পর্যন্ত এই মিশনের প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ধারণ করবে।

