
১৯৯৭ সালে সেপ্টেম্বরের ২য় সপ্তাহে ইংল্যান্ডে পৌছিয়ে সোমবার ক্লাসে অনেক নতুন মুখের সাথে বসলাম পরিচিত হওয়ার আগে কারন এক সপ্তাহ আগে পরিচিতি অনুষ্ঠান হয়ে গেছে। আমি সেটা মিস করেছি দেরীতে আসার জন্য। মাষ্টার্স প্রোগামের এ কোর্সের ১৪ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে ৮ জনই আফ্রিকা মহাদেশের। আমি পৌছার আগেই কাপ পিরিছ ধোয়ার একটি নামের তালিকা তৈরী হয়ে আছে তাতে দেখলাম আমার নাম। ক্লাসে চা-কফি খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে ছাত্র-ছাত্রীরা। কাপ পিরিছ এক এক দিন এক একজন ক্লাস শেষে ধুয়ে মুছে রেখে যাবে।
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের ছাত্র-ছাত্রী তারাও আমাদের মতো সে দেশের সরকারী কর্মকর্তা। ধীরে ধীরে পরিচিত হতে লাগলাম। অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকজনের সাথে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। এদের মধ্যে তানজানিয়ার মিনজা আর ঘানার শেথ উল্লেখযোগ্য। ক্লাস শেষে লাইব্রেরীতে কম্পুটার ক্লাসে বসে প্রাকটিস করি একে অপরকে দেখিয়ে দেই।
এক শনিবারে শহরের একটি বাজারে যাবো বলে বের হয়েছি পথে দেখি শেথ একটি মনিটর আর সি পি ইউ নিয়ে বের হয়েছে। একা তার কষ্ট হচ্ছে দেখে তার কাছ থেকে সিপিইউটি নিয়ে হাটতে শুরু করলাম। বেশ পথ দুজন কথা বলছি আর হাটছি। সে ওগুলি এক পাকিস্তানি ষ্টোর থেকে কিনেছে যার কারনে ঘাড়ে করে আবার সেখানে নেয়া হচ্ছে। ষ্টোর থেকে কাজ শেষে বাইরে এলে সেথ আমাকে বলে-জানো, তুমি আমার জন্য আজ যা করলে তা আমাদের বাপেও সন্তানদের জন্য করেনা। বুঝলাম আমার বন্ধুত্ব তার মনে ধরেছে।
সে দিন ঐ শহরে মিনজাকেও পেলাম। সেও আমার ভালো বন্ধু। আমরা তিনজন মিলে বিভিন্ন ষ্টোরে ঘুরছি এটা ওটা কেনাকাটা করছি। একটি ফল মূলের দোকানে ঢুকলাম। মিনজা কিছু কলা কিনলো কিন্তু কলাগুলি Sale এ দেয়া এবং অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছে। একটু অবাক হলাম কারন আমরা সবাই এখানে পড়তে এসেছি ব্রিটিশ সরকারের বৃত্তি নিয়ে। সেথ কেমন এক দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকালো আমি তাকে বুঝতে দিলামনা যে আমি বিষয়টা খেয়াল করেছি।
অনেক দিন পর এক দিন মিনজা আমাকে বললো
-আমি কম দামী খাবার কিনি কেন জানো?
-না,
এরপর সে বললো
-কিছু টাকা সেভ করার চেষ্টা করছি, ফিরে যাওয়ার সময় একটি ফ্রিজ, একটি গাড়ী কিনে নিয়ে যাবো শিপে করে। দেশে ফিরে একটি দোকান দেব।
-কে চালাবে? আমার প্রশ্ন
-আমার স্ত্রী।
ভাবলাম মিনজা তার দেশের একজন সৎ সরকারী কর্মকর্তা যে তার জন্য দেয়া এই সামান্য সুযোগটি কাজে লাগিয়ে জীবনের বাকী দিনগুলি ভালো ভাবে যেন কাটাতে পারে। আমাদের দেশের মানুষের এমন গঠন মূলক চিন্তা ভাবনা খুব কম তারা এ রকম বৃত্তির টাকা পয়সা খেয়ে দেয়ে ফুর্তি করে সাথে সাথেই খরচ করে ফেলে।
আমরা ক্লাসে যাই, প্রতি মডিউলে এসাইনমেন্ট তৈরী করছি। সন্ধা ৬টা থেকে রাত ১০-১১টা পর্যন্ত লাইব্রেরীতে এসাইনমেন্ট টাইপ করা তারপর হোষ্টেলে ফিরে রাতে খাবার তৈরী করে খাওয়া। একদিন মিনজা বড় বড় দুবোতল পানি নিয়ে ক্লাসে এসেছে। বললো-ইদানিং খুব পিপাসা পায় তাই এই ব্যবস্থা। তাকে একটু শুস্ক মনে হচ্ছে। একটু শুকিয়েও গেছে। একদিন হলের বাইরে রাস্তায় দেখলাম তার হাতে পানির বড় বোতল। একবার ভাবলাম বলি-বোতল না নিয়ে ভাড় নিয়ে বের হবি।
হঠাৎ মনে হলো আরে আমি এসব কি ভাবছি? ওরতো ডায়াবেটিস হয়েছে। তাকে কাছে ডেকে বললাম তোমার ডায়াবেটিস হয়েছে। বললাম -আমি ডাক্তার কেউ জানেনা এখানে শুধুমাত্র ইউনিভার্সিটি অথরিটি ছাড়া। মিনজার আমার কথা বিশ্বাস হলো। তাকে বিশ্বাবিদ্যালয়ের মেডিকেল ইউনিটে যাওয়ার পরামর্শ দিলাম।
দুদিন পর মিনজা আমাকে বলছে-গতকাল ইউনিভার্সিটির ডাক্তার তোমার কথা শুনে আমাকে বললো-তোমার বাংলাদেশী ক্লাসমেট ডাক্তার ঠিকই বলেছে তোমাকে।
ডাক্তার তাকে ইনসুলিন দিয়েছে। মনে হলো তার ডায়াবেটিসের মাত্রা অনেক বেশী ।
ইয়েলোনাইফ, কানাডা

