বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগরের মহড়ায় যোগ দিয়েছে কানাডা

বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগরের মহড়ায় যোগ দিয়েছে কানাডা - the Bengali Times
বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আবারও নতুন মাত্রা পেয়েছে

বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আবারও নতুন মাত্রা পেয়েছে। বুধবার এই অঞ্চলে সিমুলেটেড (কাল্পনিক) আকাশ ও নৌ হুমকির জবাব দিতে যৌথভাবে নৌ ও আকাশ মহড়া পরিচালনা করেছে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং ফিলিপিন্স। দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত স্কারবোরো শোল এলাকায় এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয় যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চীন ও ফিলিপিন্সের মধ্যে উত্তেজনা চলছে।

ফিলিপিন্সের সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতি অনুযায়ী, স্কারবোরো শোলের পূর্ব দিকে পরিচালিত এ মহড়ায় তিন দেশের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী অংশ নেয়। মহড়ার উদ্দেশ্য ছিল “সমন্বিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা” বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করা।

- Advertisement -

এই মহড়ায় অংশ নেয় অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এইচএমএএস ব্রিসবেন, কানাডার নৌবাহিনীর ফ্রিগেট এইচএমসিএস ভিলে ডি কুইবেক, ফিলিপিন্সের নৌবাহিনীর গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট বিআরপি জোসে রিজাল। এছাড়া, মহড়ার অংশ হিসেবে একটি আকাশ প্রতিরক্ষা অনুশীলনও পরিচালিত হয়, যা ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সংঘাতে যৌথ প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ফিলিপিন্সের সামরিক বাহিনী জানায়, মহড়া সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং এই সময়ে চীনা কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী বা সন্দেহজনক মিলিশিয়া জাহাজের সঙ্গে সরাসরি কোনো মুখোমুখি ঘটনা ঘটেনি। যদিও তারা স্বীকার করেছে, চীনা বাহিনীর উপস্থিতি ওই এলাকায় সবসময়ই “ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের” মধ্যে থাকে।

অন্যদিকে, চীনা কর্তৃপক্ষ এখনো এই মহড়া নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। তবে পূর্বে বেইজিং একাধিকবার সতর্ক করে বলেছে, তারা “যেকোনো মূল্যে নিজেদের ভুখণ্ড ও জলসীমা রক্ষা করবে।” চীনের মতে, স্কারবোরো শোলসহ দক্ষিণ চীন সাগরের বেশিরভাগ অংশই তাদের “ঐতিহাসিক ভূখণ্ড”।

স্কারবোরো শোল যা ফিলিপিন্সের উপকূল থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে বর্তমানে দক্ষিণ চীন সাগরের অন্যতম সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল। চীন ও ফিলিপিন্স উভয়েই এই শোলের মালিকানা দাবি করে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, ভিয়েতনাম এবং তাইওয়ানও দক্ষিণ চীন সাগরের বিভিন্ন দ্বীপ ও অন্তরীপের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব দাবি জানায়।

বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম সামুদ্রিক বাণিজ্য রুট এটি, যার মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য পণ্য পরিবহন হয়। ফলে, এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র নিজে কোনো সার্বভৌমত্ব দাবি করে না, তবে চীনের ব্যাপক দাবির বিরোধিতা করে আসছে। ওয়াশিংটন বলছে, চীনের “নাইন-ড্যাশ লাইন” ভিত্তিক দাবি আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী। গত আগস্টে দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজও এই শোলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে, “নৌ চলাচলের স্বাধীনতা” (Freedom of Navigation) নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে।

দক্ষিণ চীন সাগরে এই যৌথ মহড়া শুধু একটি প্রতিরক্ষা অনুশীলন নয়; বরং এটি চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি কূটনৈতিক ও সামরিক বার্তা। বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিপিন্স এখন স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। চীনের আগ্রাসী অবস্থান ফিলিপিন্সকে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে বাধ্য করছে।

অন্যদিকে, চীনের নীরবতা কৌশলগত। বেইজিং সরাসরি প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ তারা জানে এ ধরনের সংঘাত বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো মিত্রদের হস্তক্ষেপ বাড়বে।

দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপিন্সের এই যৌথ মহড়া শুধু প্রতিরক্ষা অনুশীলন নয়, বরং এটি এক প্রকার রাজনৈতিক বার্তা চীনের একক কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানো। এই অঞ্চলে যে কোনো ভুল পদক্ষেপ ভবিষ্যতে বড় আকারের সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles