
কুইবেকের সেন্ট লরেন্স নদীতে পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। পানির গভীরতা হ্রাস পাওয়ায় নৌযান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, যা শুধু সামুদ্রিক পরিবহনই নয়, বরং নগরজীবন, শিল্পখাত ও পানির গুণগত মানকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।
সেন্ট লরেন্স সিওয়ে ম্যানেজমেন্ট করপোরেশনের মুখপাত্র কেভিন লাজোই জানিয়েছেন, লেক সেন্ট লুইস এলাকায় পানির স্তর দ্রুত কমে যাওয়ায় জাহাজের গতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। তিনি বলেন, “এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা নৌযানের গতি সীমিত করেছি। অতিরিক্ত গতি এখন মারাত্মক দুর্ঘটনা ডেকে আনতে পারে।”
কানাডিয়ান হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিসের বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সিস ফরটিন-লেগু সতর্ক করে বলেছেন, জাহাজ চালকদের এখন ধরেই নিতে হবে অফিসিয়াল ম্যাপে প্রদর্শিত গভীরতা বাস্তবে অন্তত ১০ সেন্টিমিটার কম। অর্থাৎ নাব্যতা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
কর্তৃপক্ষের মতে, বাঁধ পরিচালনার কারণে পানির প্রবাহ সীমিত হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত কয়েক সপ্তাহে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি। ফলে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে নাব্যতা সংকট তীব্র হয়েছে।
কানাডিয়ান কোস্ট গার্ড গত ৬ আগস্ট একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশে জানিয়েছে, মন্ট্রিয়ল থেকে ট্রয়িস-রিভিয়েরেস পর্যন্ত স্থাপিত বয়াগুলো পানির স্তর হ্রাস পাওয়ায় সঠিক অবস্থান নির্দেশ করতে পারছে না। এতে নদীপথে চলাচল অনির্ভরযোগ্য হয়ে উঠছে, যা সরাসরি সামুদ্রিক পরিবহনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে।
নাব্যতা সংকট শুধু পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নেই। মন্ট্রিয়ল শহর ইতোমধ্যেই এর সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়েছে। রিভিয়েরা দেস প্রেইরিস এলাকায় পানি সমতল এতটাই কমে গেছে যে লন ওয়াটারিংসহ বিভিন্ন পানিকেন্দ্রিক কার্যক্রমে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, পানির গভীরতা হ্রাসের ফলে গুণগত মানও নষ্ট হচ্ছে। এতে শহরের পানি শোধনাগারগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে নগরবাসীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেন্ট লরেন্স নদী কানাডার সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ বহন করে। প্রতিবছর ২০০ মিলিয়ন টনেরও বেশি পণ্য এ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। নাব্যতা সংকটে এ পরিবহন ব্যাহত হলে দেশজুড়ে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে শস্য, কাঠ, খনিজ এবং পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্য পরিবহনে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বড় কারণ। কুইবেক অঞ্চলে ২০২৫ সালের জুন ও জুলাই মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হ্রদ ও নদীগুলো দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শুধু সেন্ট লরেন্স নয়, আশপাশের জলাধারও সংকটে পড়ছে।
কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই সমন্বিত পরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছে। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে এ ধরনের সংকট যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে সামুদ্রিক পরিবহন, নগরজীবন ও শিল্প খাত কতটা প্রস্তুত? সেন্ট লরেন্স নদীর নাব্যতা সংকট আসলে একটি বড় সতর্কবার্তা, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পানি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নতুন করে ভাবনার দাবি রাখে।
সেন্ট লরেন্স নদীর এ সংকট তাই শুধু কুইবেক বা মন্ট্রিয়লের সমস্যা নয়; বরং এটি পুরো কানাডার অর্থনীতি, পরিবেশ ও জীবনযাত্রার জন্য এক কঠিন পরীক্ষার সময়।

