
১৯৭১ সালে জুলাই কিংবা আগস্ট মাসে আমি কোলকাতার নিউমার্কেটের দিকে হাঁটছিলাম। সকালে সরকারী হাসপাতালে দুটো দাঁতের ফিলিং করা হয়েছে। ডেন্টিস বলেছে বিকেলে অন্য একটি দাঁতের ফিলিং করে দিবে। মাঝখানের সময়টাতে গিয়েছিলাম নিউমার্কেটের দিকে। সাথে ছিলেন চব্বিশ পরগনা, বশিরহাট মহকুমার বাকুন্ডিয়া গ্রামের জমিদার ও বিধান সভার সদস্য শ্রী রাধা কিশোর ঘোষ। হটাত দেখি আমাদের প্রিয় মুস্তফা মানোয়ার ভাই নিউ মার্কেটের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আমি ‘ডি আই টি’ টেলিভিশন ভবনে যেতাম ছোটদের অনুষ্ঠান করার জন্য। তখন তাঁকে অনেকবার দেখেছি টেলিভিশন ভবনে। রঙ্গিন চক দিয়ে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য ব্যাকগ্রাউন্ড ছবি এঁকে দিতেন। জীবনের প্রথম এসেছি কোলকাতা শহরে আর এসেই দেখি মুস্তফা মানোয়ার ভাই। ওনাকে দেখার সাথে সাথে চোখের সামনে বাংলাদেশ ভেসে উঠল। হাত উঁচিয়ে তাঁকে সালাম করলাম। তিনি আমাকে না চিনেই স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন; কেমন আছ? ভাল আছি বলেই আমরা যেদিকে যাচ্ছিলাম সেদিকে এগিয়ে গেলাম। পরে রাধা কিশোর ঘোষ বাবু জিজ্ঞেস করলেন ‘ওনি কি তোমাদের জয় বাংলার লোক’? সব শুনে টুনে তিনি বললেন তুমি যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে অনুষ্ঠান করার কথা বলছিলে তিনিতো তোমাকে এব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন। এরপর আমরা দুজনেই ফিরে এলাম তাঁকে খুঁজতে। না তাঁকে আর খুঁজে পেলাম না। যদি সেদিন তাঁকে ফিরে পেতাম তবে হয়তো একটা বড় আশা পূরণ হতো। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার আগে আমি ঢাকার রেডিও এবং টেলিভিশনে অংশগ্রহণ করতাম। ২৪ মার্চ (১৯৭১) তারিখে আমার একটি অনুষ্ঠান রেকর্ডিং করার কথা ছিল। প্রযোজক ছিলেন মুসা ভাই। এই রেকর্ডিং ব্যবস্থাকে তখন বলা হতো ‘ভি টি আর’। পাকিস্তান মিলিটারি বাঙালি একজন কর্মচারীর গায়ে হাত তুলেছিল বলে টেলিভিশন কর্মচারীরা সেদিন কাজে যোগ দেয়নি। আমাদের গাড়ি (রোজী রুনি, কলি জলি সহ আরো অনেকে ছিল) ডি আই টি’র গেট থেকে ফিরে এলো। বাংলাদেশ স্বাধীনতার ইতিহাসের সাথে এই ঘটনাও জড়িত। ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চ লাইট শুরুর আগের দিন ঢাকা টেলিভিশন থেকে কোন অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়নি। সে কারণেই আমি সব সময় ভাবতাম স্বাধীন বাংলা বেতারে যদি ‘স্কুল ব্রডকাস্টিং’ অনুষ্ঠানটা শুরু করা যেতে তবে খুব ভাল হতো। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পের জন্য ছেড়ে দেওয়া বিশাল এলাকার মালিক জমিদার রাধা কিশোর কোলকাতায় আসছিলেন। দাঁতের ব্যথায় অস্থির হয়ে আমি সুলতান সাহেবের তাবুতে গিয়ে অনুরোধ করলাম কিছু একটা যদি করা যায়। আর তো পারছি না। ঘোষ বাবু তখন সেই তাবুতে বসে চা খাচ্ছিলেন। ক্যাম্প ইন-চার্জ ক্যাপ্টেন সুলতান তাঁরই সাথে আমাকে কোলকাতায় পাঠিয়ে দিলেন। দানবীর রাধা কিশোর ঘোষ খুশি হয়েই আমার চিকিৎসার দায়িত্ব হাতে তুলে নিলেন। কোলকাতা আসার পথে তাঁকে বলেছিলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে একবার যেতে পারলে স্কুলের ছেলে-মেয়েদের জন্য অনুষ্ঠান করার চেষ্টা করবো। পরে আর সেখানে যাওয়া হয় নি। দাঁতের চিকিৎসা শেষ করে ফিরে আসি বাকুন্ডিয়া ক্যাম্পে।
প্রিয় গুণী চিত্রশিল্পী মুস্তফা মানোয়ারের সাথে যদি কারোর যোগাযোগ থাকে তবে কি আমাকে তাঁর ফোন নম্বরটা ইন বক্সে দিতে পারবেন? খুব জানতে ইচ্ছে করছে সেদিনের সেই কথাটি তাঁর মনে আছে কিনা। কোলকাতার পথে একটি কিশোর তাঁকে সালাম দিয়েছিল এমন সামান্য কথা হয়তো তাঁর মনে থাকার কথা না কিন্তু আজও আমি সে কথা ভুলতে পারিনি।
স্কারবোরো, কানাডা

