একটি অমলিন স্মৃতি

একটি অমলিন স্মৃতি - the Bengali Times
কলিং বেল টিপতেই দরজাটা খুলে গেল একগাল হাসিতে চোখ মুখ উজ্জ্বল করে তিনি বললেন আপুরে কতদিন পর তোমাকে দেখলাম

কলিং বেল টিপতেই দরজাটা খুলে গেল, একগাল হাসিতে চোখ -মুখ উজ্জ্বল করে তিনি বললেন, ‘আপুরে, কতদিন পর তোমাকে দেখলাম।’

আমাদের ছবি আপা, আমার বড় বোনের ছোট ননদ, এমনিতেই তাঁর ডাগর ডাগর চোখ দুটো কথা বলে আর হাসলে তো কোন কথাই নেই।

- Advertisement -

তাঁর ছোট ছোট দুই কন্যা অবাক হয়ে আমাকে দেখছে,আমি ওদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই ওরা দু’জন দুদিক থেকে জড়িয়ে ধরলো আমায়। ছবি আপা বললেন,

‘ওরা সকাল থেকে অপেক্ষা করে আছে, কখন খালা আসবে? আজ এই ছুতোয় ওরা স্কুলেও যায়নি।’

ওরা রাখি ও মুনমুন, ছবি আপার দুই মা-জননী। ছবি আপার ছেলেটা বড়, নাম রানা। সে এখন স্কুলে,বড় ক্লাসে পড়ে যার জন্য তাকে স্কুলে যেতে হয়েছে।

রাখি-মুনমুনের খালুর মানে আমার জীবনসঙ্গীর একটা অফিসিয়াল ট্যুর ছিল যশোরের চৌগাছা উপজেলায়, সেই কারণেই আমাদের চৌগাছায় যাওয়া। ছবি আপারা তখন চৌগাছাতে থাকেন, দুলাভাই সেখানকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

অনেক দিন পর আমাদের দু-বোনের দেখা। আমাদের গল্প যেন ফুরোয় না। আমাদের যাওয়া উপলক্ষ্যে ছবি আপা প্রত্যেক বেলায় আলাদা আলাদা মেনু তৈরি করেন, নিষেধ করলে শোনেন না। উল্টে আক্ষেপ করে বলেন যে কিছুই খাওয়াতে পারছেন না।

রাতে রাখি, মুনমুনের আব্দার, ‘খালা গল্প করেন।’

ছবি আপা ওদের বলেন,’আমাদের একটু গল্প করতে দে। কতদিন পর বোনটাকে কাছে পেয়েছি।’

ওরাও ঠোঁট ফুলিয়ে বলে, ‘তুমি তো সারাদিন খালার সাথে গল্প করেছো।’

শামসুল হক দুলাভাই এসে খোঁজ নেন আমাদের। দুলাভাইও আক্ষেপ করে বলেন যে আমাদের ঠিকমতো আদর – আপ্যায়ন করতে পারছেন না। দুলাভাই খুব সুন্দর মনের অমায়িক মানুষ, আবার খুব

রসিকও।

আমি বটলগ্রীন কালারের একটা সিল্ক শাড়ি পরে আপার বাসায় গিয়েছিলাম। আপা এক

ফাঁকে বললেন,’এই কালারের শাড়িতে তোমাকে খুব মানিয়েছে। কালারটা আমার খুব প্রিয় কিন্তু ভয়ে পরিনা, আমাকে মানাবে না তাই।’ আমি বলি,’আমাকে মানালে আপনাকেও মানাবে।’ ছবি আপা হাসেন, তাঁর সেই ভুবন ভোলানো হাসি, হাসলে আপাকে যে কী সুন্দর লাগে!

ছবি আপা আমার বড় বোনের আদরের ছোট ননদ, আর আমি আমার বড় দুলাভাইয়ের আদরের একমাত্র শালিকা। ছবি আপা ও আমাকে একসাথে বাইরের কেউ দেখলে নিজের আপন বোন মনে করে, আমরা নিজেরাও সেটাই মনে প্রাণে বিশ্বাস করি।

সেবার ছবি আপা আমাকে খুব সুন্দর একটা মেরুন রঙের কাশ্মীরি

শাল উপহার দিয়েছিলেন।

রাখি, মুনমুনের খালু মানে আমার জীবনসঙ্গী যশোর সদরের ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছেন, ছবি আপারা তখনো চৌগাছাতে। শামসুল হক দুলাভাইকে মাঝে মাঝে অফিসের কাজে যশোর আসতে হতো। ছবি আপা আমার জন্য টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি করে বিভিন্ন ধরনের পিঠা,পায়েস রান্না করে পাঠাতেন।

আপার রান্নার হাত ছিল দারুন!

বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ থাকলে আপাও বাচ্চাদের নিয়ে দুলাভাইয়ের সাথে চলে আসতেন। তখন আমরা দু-বোন খুব আনন্দ করে, গল্প করে সময় কাটাতাম। বাচ্চারাও খুব খুশি হতো, ওদের মায়ের আদরের বোনটা যে ওদেরও খুব প্রিয় খালা।

অনেক বছর পর রাখি-মুনমুনের খালু যখন রাজশাহীর জেলা প্রশাসকের পদে যোগদান করেন তখন দুলাভাইয়ের সাথে দেখা হলেই আমাকে বলতেন,’ডিসি সাহেব’। আমি হাসি সামলে জানতে চাইতাম,’আমি কি করে ডিসি হলাম?’

দুলাভাই বলতেন,’আসল ডিসি তো ডিসিদের বৌরা। সব দাপট তো তাদেরই।’

খুব মধুর সম্পর্ক ছিল আপা – দুলাভাইয়ের মধ্যে। দুজনই দুজনকে খুব সম্মান করতেন, ভালোবাসতেন।

আপার তিন বাচ্চাই এখন অনেক বড়। তাদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। রানা ব্যাংকে ও রাখি কলেজে অধ্যাপনা করে। আপা নানিও হয়ে গেছেন। এবার আপার দাদী হওয়ার সময় এসেছে, ভীষণ খুশি আপা। দেখা হলে বলেন, ‘শাপলার জন্য বেশি করে দোয়া কোরো।

ও প্রথম মা হতে চলেছে।’ শাপলা,আপার একমাত্র ছেলের বৌ। নিজের মেয়ের মতো আদরে আগলে রাখেন শাপলাকে।

দাদী হয়েছেন ছবি আপা, জানতে চাইলাম কি নাম রাখলেন নাতনির? তৃপ্তির হাসি দিয়ে জানালেন, ‘ঝিলিক নামটা আমার খুব পছন্দ।’

সুস্থ ও প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর ছবি আপা একদিন হঠাৎই বিনা নোটিশে তার প্রিয়জনদের থেকে দূরে, অনেক দূরে হারিয়ে গেলেন। রাতে শুধু দুলাভাইকে বলেছিলেন, ‘আমার শরীরটা ভালো লাগছে না।’ ব্যাস, ঐটুকুই।

‘ঝিলিক নামটা আমার খুব পছন্দ’ ছবি আপার সাথে এটাই আমার শেষ কথা।

খুব মিস করি আপাকে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles