
২০১৬ সালের জুলাই-আগষ্ট মাস। ইনুভিক রিজিওনাল হসপিটালে আমার চাকুরীর এক বছর পার হলো। এই এক বছরে এ এলাকার বাইরে কোথাও যাওয়া হয়নি। চারিধারে পাহাড় ঘেরা ছোট্ট এ শহর। ৮ মাইল দূরে এয়ারপোর্ট। কাছের শহর এখান থেকে ১২ ঘন্টা গাড়ী চালিয়ে যেতে হয় তাই এই এয়ারপোর্টই একমাত্র সম্বল এ এলাকার বাইরে বের হওয়ার। বিমান ভাড়াও এখানে আকাশ ছোঁয়া তাই চাকুরীজীবিদের পক্ষেই সম্ভব প্রয়োজনে এ শহরে বাইরে যাওয়া।
একটা সুযোগ এলো এডমন্টন শহরে Canadian Health Information Management Association (CHIMA) এর বাৎসরিক সম্মেলনে অংশ নেয়ার। এ সংস্থার আমি একজন স্থায়ী সদস্য। অফিসে জানালাম যে আমি উক্ত সম্মেলনে অংশ নেব। আমাদের Professional Development এর জন্য এরকম সম্মেলনে আংশ গ্রহন করাও দরকার। অফিস আমার আবেদনে সাড়া দিয়ে প্লেনের টিকেট, হোটেলে থাকার ব্যবস্থা সহ সকল কিছুই সরকারের প্রদেয় সুবিধা অনুযায়ী করে দিল।
টিকেট সহ সব কাগজ পত্র হাতে আসার পর দেখলাম আমার সম্মেলন স্থল থেকে দূরের এক হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপত্তি জানালাম কারন আমি যেখানে সম্মেলন হবে সে হোটেলেই থাকার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। অফিস সেটা বুঝতে পারেনি উপরন্তু যুক্তি দেখাল যে হোটেলটি Five Star. এ দেশে সব কিছু হয় যুক্তিতে তাই যুক্তি দিলাম যে আমার সম্মেলন স্থল আর আমার আবেদনের হোটেলটি একই। আমার সেখানে দুদিন থেকে সম্মেলনে অংশ নিতে সুবিধাই হবে।

এবার কাজ হলো। আমি যথা সময়ে সম্মেলনে অংশ নিলাম। একঘেয়ে জীবনে একটু ভিন্নতার, বৈচিত্রের পরশ পেলাম প্রায় ১০ বছর পর কারন ২০০৫ এ কানাডা আসার পর এমন সুযোগ আর পাইনি। দুদিন পর ফেরার পালা। সকালে একটি ট্যাক্সি ডেকে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে উঠে বসলাম। ড্রাইভার ২৪-২৫ বছরের হালকা পাতলা এক যুবক। যুবকই দু’একটি কথা জিজ্ঞাসা করলো। আমি উত্তর দিলাম। মনে হলো এ ছেলেটির সাথে কথা বলা যায়;
ট্যাক্সি চালকদের লাইসেন্স দেয়ার সময় ছোট্ট একটা ট্রেনিং হয় তাতে যাত্রীদের সাথে কথা বলতে তাদেরকে নিরুৎসাহিত করা হয়। আমি তার কথায় কিছু মনে না করেই এটা ওটা জানতে চাই তার কাছে।
-তোমার বাড়ী কোথায়?
-পান্জাবে।
-এখানে এলে কিভাবে।
-বিয়ে করে এসেছি, স্পাউস ভিসায়।
এডমন্টন কানাডার আলবার্টা প্রভিন্সের রাজধানী, এখানে অনেক ভারতীয় আছে যাদের মধ্যে বেশিরভাগই পান্জাবের অধিবাসী।
-তোমার বাচ্চা আছে?
-একটি ২ বছরের মেয়ে। বচ্চার কথা জানতে চাওয়ায় মনে হলো সে খুব খুশী।
-তোমার বাচ্চা আছে?
-হ্যাঁ, এক ছেলে।
আমার ছেলের বয়স না বলাতে সে হাত দিয়ে দেখিয়ে অনুমান করার চেষ্টা করলো, তাকে বললাম
-না, সে অনেক বড়। তোমার সমান বয়স হবে।
-বলো কি? আমিতো ভাবছি তোমার ছেলে ছোট, তোমাকে দেখেতো বোঝা যায়না যে তোমার বড় একটা ছেলে আছে।
আমি ডাক্তার শুনে সে এবার মন খুলে সব বলতে শুরু করলো, বললো
-আমি একটু নেশা করি, তাতে কি ক্ষতি আছে?
-কেন করো?
উত্তর নেই।
-তোমার স্ত্রী পচ্ছন্দ করে?
-না।
-তাহলে নেশা করো কেন?
দু’একটা কুফলের কথা বললাম এবং তার মেয়ের ভবিষ্যতের কথা তাকে মনে করিয়ে দিলাম। মনে হলো সে একটু লজ্জা পেল।
এয়ারপোর্টে নেমে তার হাতে বাড়তি কিছু ডলার দিয়ে বললাম বাড়তি তোমার মেয়ের জন্য। তার দু’চোখ চক চক করে উঠলো।
আমার ছেলের বয়সী এই পান্জাবী যুবক ও তার ছোট্ট পরিবারের জন্য মনের কোথায় যেন একটু মায়া অনুভব করলমা। একবার পিছু ফিরে দেখলাম সে দাঁড়িয়ে আছে আমার পথের দিকে চেয়ে।
ইয়েলোনাইফ, কানাডা

