
নেদারল্যান্ডসে স্বেচ্ছামৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জান ও এলস দম্পতি। জীবনের শেষ দিনটিও একসঙ্গে কাটাতে চেয়েছিলেন তারা। ২০২৪ সালের ৩ জুন চিকিৎসকের দেওয়া প্রাণঘাতী ওষুধে পাশাপাশি শুয়ে মৃত্যুবরণ করেন দু’জন। তাদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের শারীরিক যন্ত্রণা ও ডিমেনশিয়ার মতো জটিল অসুস্থতা। তবে বাবা-মায়ের একসঙ্গে মৃত্যুর সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও এর পরিণতি যে এতটা বেদনাদায়ক হবে, তা কল্পনা করতে পারেননি তাদের একমাত্র সন্তান বাস।
দুই বছরের বেশি সময় পর বাবা-মাকে হারানোর সেই অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তী নিঃসঙ্গতার কথা জানিয়েছেন বাস। তার ভাষ্য, বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেও দু’জনকে একই সময়ে হারানোর শোক তাকে গভীরভাবে বিপর্যস্ত করেছিল।
নেদারল্যান্ডসে চিকিৎসকের সহায়তায় স্বেচ্ছামৃত্যুর এই বিশেষ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ডুয়ো-ইউথানেশিয়া’। এতে কোনও দম্পতি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে একই সময়ে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাস জানান, মৃত্যুর কয়েক মাস আগে থেকেই তিনি বাবা-মাকে সিদ্ধান্তটি পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। অন্তত শীতকাল কিংবা পরের বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তার বাবা জান দীর্ঘ ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে অসহ্য ব্যথায় ভুগছিলেন। অন্যদিকে মা এলসের আলঝেইমারজনিত ডিমেনশিয়া ধীরে ধীরে বাড়ছিল। বাসের আশঙ্কা ছিল, বেশি দেরি করলে মায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে স্বেচ্ছামৃত্যুর আইনি অনুমোদন পাওয়াও কঠিন হতো।
মৃত্যুর দিন বাবা-মাকে গাড়িতে করে স্থানীয় একটি হসপিসে (জীবনের শেষ পর্যায়ের বিশেষায়িত সেবাকেন্দ্র) নিয়ে যান বাস। যাওয়ার পথে বাবা জান ছেলেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কি না। এতে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি। তবে পরে ছেলের আশ্বাসে শান্ত হন।
হসপিসে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা তাদের সঙ্গে সময় কাটান। একপর্যায়ে বাসের মনে হয়েছিল, সবকিছু থামিয়ে বাবা-মাকে নিয়ে ফিরে যাবেন। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি করতে চাননি তিনি।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চিকিৎসকেরা দু’জনকে প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগ করেন। পাশাপাশি শুয়ে হাত ধরে মৃত্যুর অপেক্ষা করছিলেন তারা। বাবা-মায়ের সেই দৃশ্য বাসের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।
তবে মৃত্যুর পর শুরু হয় তার কঠিন সময়। ভাইবোন না থাকায় শোক ভাগ করে নেওয়ার মতো কেউ ছিলেন না। চার-পাঁচ সপ্তাহ ধরে শারীরিক অসুস্থতা ও যন্ত্রণায় ভুগেছেন তিনি। তার কথায়, দু’জনকে একই সময়ে হারানোর অভিঘাত ছিল অত্যন্ত গভীর।
নেদারল্যান্ডসের আঞ্চলিক স্বেচ্ছামৃত্যু পর্যালোচনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে ৯ হাজার ৯৫৮ জন স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেন। তাদের মধ্যে ৪২৭ জন ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। একই বছরে ৫৪ জোড়া দম্পতি, অর্থাৎ ১০৮ জন ডুয়ো-ইউথানেশিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুবরণ করেন।
বাবা-মায়ের মৃত্যুর দুই দিন আগে তাদের উদ্দেশে প্রায় আট পৃষ্ঠার একটি চিঠি লিখেছিলেন বাস। সেখানে তাদের সঙ্গে কাটানো জীবনের স্মৃতি, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। চিঠিটি পড়ে বাবা জান ছেলেকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। বাসের ভাষায়, বাবার কাছ থেকে পাওয়া সেই আলিঙ্গন ছিল জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। তার মনে হয়েছে, একে অপরকে বলার মতো আর কিছুই বাকি ছিল না।

