
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকার বৈদেশিক সহায়তা নীতিকে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশটির বৈদেশিক সহায়তা খাতের একাংশে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই নীতির ফলে উন্নয়ন সহায়তার মূল লক্ষ্য দারিদ্র্য হ্রাস ও মানবিক উন্নয়ন ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে পারে।
দারিদ্র্য নিয়ে কাজ করা অ্যাডভোকেসি সংগঠন রেজাল্টস কানাডার মতে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তার প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দারিদ্র্য কমানো এবং সংঘাত, রোগ ও অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের মতো সমস্যার পেছনে থাকা কারণগুলো মোকাবিলা করা। সংগঠনটির যুক্তি, আন্তর্জাতিক উন্নয়নে কানাডার বিনিয়োগ শুধু মানবিক দায়িত্ব পালনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও জড়িত।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মানুষের জন্য এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক সহায়তার অর্থ দিয়ে শিশুদের শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়। ফলে এর সুফল শুধু সহায়তা গ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে দাতা দেশগুলিও লাভবান হয়।
তবে বৈদেশিক সহায়তার সঙ্গে বাণিজ্যিক স্বার্থ জুড়ে দেওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। ‘টাইড এইড’ বা শর্তযুক্ত সহায়তার ক্ষেত্রে দাতা দেশের অর্থ সাধারণত সেই দেশের কোম্পানির তৈরি পণ্য ও পরিষেবা কেনার জন্য ব্যবহার করা হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে নিজস্ব শিল্পকে সুবিধা দেওয়া এবং বিদেশি বাজারে দেশীয় সংস্থাগুলোর প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা।
এর উদাহরণ হিসেবে জাপানের বৈদেশিক সহায়তার কথা বলা যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সড়ক ও বন্দর নির্মাণের মতো প্রকল্পে জাপানি সহায়তার অর্থ ব্যবহার করে জাপানের নির্মাণ সংস্থাগুলোকে নিয়োগ দেওয়ার নজির রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর স্থানীয় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রেই সেই কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার কৃষকদের কাছ থেকে উদ্বৃত্ত শস্য কিনে তা নির্দিষ্ট দেশগুলোতে পাঠিয়ে থাকে যার মাধ্যমে একদিকে বিদেশে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়, অন্যদিকে দেশটির কৃষিখাতও সুবিধা পায়।
২০০৩ সালে জার্নাল অব দ্য জাপানিজ অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, বড় দাতা দেশগুলো বৈদেশিক সহায়তা হিসেবে যে অর্থ ব্যয় করে, তার প্রতি এক ডলারের বিপরীতে গড়ে ১.৩৩ ডলারের রপ্তানি করতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ সহায়তা অনেক সময় দাতা দেশের অর্থনীতির জন্যও প্রত্যক্ষ বাণিজ্যিক সুবিধা তৈরি করে।
তবে এই ধরনের ‘টাইড এইড’ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নমূলক প্রকল্প যেমন হাসপাতাল নির্মাণ বা শিক্ষা পরিকাঠামো তৈরিতে বেশি ব্যবহৃত হয়। জরুরি মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে এর ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম।
এই প্রেক্ষাপটেই কানাডার কার্নি সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সরকার ইতিমধ্যেই বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ কমিয়েছে। পাশাপাশি এই খাতের দায়িত্ব মন্ত্রী পর্যায়ের পদ থেকে সরিয়ে স্টেট সেক্রেটারি পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তির হাতে দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বাণিজ্য ও বৈদেশিক সহায়তা দুই ক্ষেত্রের দায়িত্ব একজন পার্লামেন্টারি সেক্রেটারির হাতে দেওয়া হয়েছে।
নীতিনির্ধারণের এই পরিবর্তনকে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, বাণিজ্য ও বৈদেশিক সহায়তাকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে কানাডা যদি উন্নয়ন সহায়তাকে ক্রমশ নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে আন্তর্জাতিক উন্নয়নের মানবিক লক্ষ্যটি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন, কানাডার বৈদেশিক সহায়তা কি শুধুই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়ার হাতিয়ার হবে, নাকি দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈশ্বিক মানবিক উন্নয়নের দীর্ঘদিনের লক্ষ্যও সমান গুরুত্ব পাবে। কার্নি সরকারের নীতির পরবর্তী পদক্ষেপেই তার উত্তর মিলবে।

