
ক্ষমতার অলিন্দে বিরহ বলে সত্যিই কোনো শব্দ আছে কি না জানি না।
তবু মনে হয়, বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন সাহেব আজকাল কিছুটা অস্বস্তির মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন। কারণ, প্রধানমন্ত্রী তাঁকে কিছুটা ভর্ৎসনা করেছেন বলে শোনা যায়। রাজনীতিতে অনেক সময় বিরোধীদের সমালোচনার চেয়ে নিজের নেতার একটি বাক্যই বেশি ভারী হয়ে ওঠে।
মিলন সাহেবকে আমার বরাবরই একজন পরিশ্রমী মানুষ বলে মনে হয়েছে। এ বয়সেও তিনি শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার জন্য মাঠে-ময়দানে ছুটে বেড়াচ্ছেন। শপথ গ্রহণের দিন দেরি হওয়ায় সংসদ ভবনের লবিতে তাঁর দৌঁড় ও লাফ দেয়া যেন সেই কর্মচাঞ্চল্যেরই প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কাজ করার আন্তরিকতা তাঁর মধ্যে আছে—এ কথা অস্বীকার করা কঠিন।
তাঁকে আমার কাছে সৎ মানুষও মনে হয়। অবশ্য এটি আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন, কোনো চূড়ান্ত সত্য নয়।
তাঁর কণ্ঠস্বর কর্কশ, কথাবার্তাও সব সময় খুব গোছানো হয় না। এর পেছনে ব্যক্তিগত ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার বিষয়ও রয়েছে। এখানে তার কোন হাত নেই—এ কারণে ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে বিদ্রূপ করা যেমন অন্যায়, তেমনি জনসমক্ষে অসাবধানী বা বেফাঁস মন্তব্যের দায়ও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। একজন মন্ত্রীর সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তাঁর সিদ্ধান্ত নয়, তাঁর উচ্চারিত শব্দও।
বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ আছে “তলোয়ারের আঘাত শুকিয়ে যায়, কথার আঘাত শুকায় না।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই প্রবাদটির গুরুত্ব যেন আরও বেড়ে গেছে। আগে একটি ভুল বক্তব্য কয়েকজনের কানে পৌঁছাত; এখন কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা কোটি মানুষের মোবাইলের পর্দায় হাজির হয়। একটি বাক্যকে কেটে, জুড়ে, বিকৃত করে কিংবা প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে নতুন অর্থ তৈরি করতে খুব বেশি সময় লাগে না। তাই রাজনীতিবিদদের আজ শুধু সৎ হলেই হয় না, ভাষার প্রতিও সতর্ক হতে হয়।
আমাদের সময়ের আরেকটি বাস্তবতা হলো প্রজন্মগত ব্যবধান। বর্তমানের তরুণেরা তথ্যের জগতে অভূতপূর্ব সুবিধা নিয়ে বড় হচ্ছে। গুগল, ইউটিউব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সবকিছু তাদের হাতের মুঠোয়। ফলে অনেক সময় তাদের মধ্যে এমন একটি বিশ্বাস জন্মায় যে, সব প্রশ্নের উত্তর তারা জানে। কিন্তু তথ্য জানা আর প্রজ্ঞা অর্জন এক জিনিস নয়। অভিজ্ঞতা মানুষের বিচারবোধকে যে গভীরতা দেয়, কোনো সার্চ ইঞ্জিন বা এআই তা একদিনে দিতে পারে না।
অন্যদিকে, প্রবীণদেরও মনে রাখতে হবে—আজকের তরুণেরা প্রশ্ন করতে শিখেছে। তারা অনেক বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানায়, প্রতিবাদ করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করে। কখনো সেই প্রতিক্রিয়া মাত্রাতিরিক্ত হয়, কখনো আবার সেটি গণতান্ত্রিক অধিকারেরই বহিঃপ্রকাশ। তাই দুই প্রজন্মের মধ্যে সংলাপের প্রয়োজন, সংঘাতের নয়।
এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে সাম্প্রতিক শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। দাবি-দাওয়া থাকতেই পারে, প্রতিবাদও গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক অংশ। তবে যে কোনো আন্দোলনের স্থায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার জনসমর্থন, নেতৃত্ব, উদ্দেশ্য এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের তথাকথিত “ককরোচ জনতা পার্টি” নামের একটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগও আলোচনায় এসেছিল। সেদেশের প্রধানবিচারপতির একটা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই ককরোচ জনতা পার্টির উদ্ভব হয়। কোন একটা বক্তৃতায় তিনি তরুনদের ককরোচ বলেছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং প্রাথমিক কৌতূহল থাকলেও সেটি বাস্তবে উল্লেখযোগ্য গণভিত্তি তৈরি করতে পারেনি এবং কোনো বড় রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। জনমত, সাংগঠনিক শক্তি এবং বাস্তব রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় ভর করে দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন গড়ে তোলা যে কঠিন—এই ঘটনাও তার একটি উদাহরণ।
বাংলাদেশেও একই বাস্তবতা অনেকাংশে প্রযোজ্য। একটি নির্বাচিত সরকারকে ঘিরে অসন্তোষ, সমালোচনা কিংবা প্রতিবাদ থাকতেই পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তৃত জনসমর্থন ছাড়া বড় ধরনের আন্দোলন সাধারণত সফল হয় না। তাই বর্তমান এইচএসসি-পরীক্ষা সংক্রান্ত আন্দোলন সরকারকে সাময়িক অস্বস্তিতে ফেললেও, সেটি কত দূর গড়াবে—তা সময়ই বলে দেবে।
তবে এই পুরো ঘটনায় একটি শিক্ষা রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় সিদ্ধান্ত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই সিদ্ধান্তকে কী ভাষায় জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। একজন মন্ত্রীর একটি অসতর্ক মন্তব্য অনেক সময় তাঁর কয়েক মাসের পরিশ্রমকে ম্লান করে দিতে পারে। রাজনীতিতে কাজের মূল্য যেমন আছে, তেমনি কথারও একটি রাজনীতি আছে। আর সেই রাজনীতিতে অনেক সময় একটি বাক্যই সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।
টরন্টো, কানাডা

