
কানাডায় টানা প্রায় দুই বছর ধরে বাড়িভাড়া কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকলেও সাধারণ ভাড়াটিয়াদের আর্থিক স্বস্তি ফেরেনি। বরং নতুন এক সমীক্ষা বলছে, ভাড়া কিছুটা কমলেও অধিকাংশ মানুষের জন্য বাসা ভাড়া নেওয়া এখনো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ক্রয়ক্ষমতার সংকট এবং আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্যই এখন কানাডার ভাড়াবাজারের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি আবাসনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম রেন্টালসডটসিএ পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের বড় বড় আবাসন বাজারে বসবাসকারী ভাড়াটিয়াদের মধ্যে বেশিরভাগই উচ্চ ভাড়াকে নতুন বাসা খোঁজার সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সমীক্ষায় অংশ নেন মোট ১,১৯৪ জন ভাড়াটিয়া, যাদের কাছে বর্তমান ভাড়া পরিস্থিতি, আবাসন খোঁজার অভিজ্ঞতা, পারিবারিক অবস্থা, আয়, মাসিক বাজেট এবং ভাড়াবাজার সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মতামত নেওয়া হয়।
সমীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, প্রায় ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, নতুন বাসা খুঁজতে গিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন উচ্চ ভাড়ার কারণে। যদিও গত কয়েক মাস ধরে জাতীয় পর্যায়ে ভাড়া কমছে, তবুও তা অধিকাংশ পরিবারের সামর্থ্যের মধ্যে আসেনি। অন্যদিকে ১১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, বাজারে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য ভাড়ার তালিকা (লিস্টিং) পাওয়া কঠিন হওয়াও একটি বড় সমস্যা। আবার ৬ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, ভাড়ার জন্য উপযুক্ত আবাসনের সীমিত সরবরাহ তাদের জন্য প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমীক্ষাটি বলছে, সমস্যার মূল কারণ শুধু ভাড়ার হার নয়, বরং মানুষের আয় ও ভাড়ার খরচের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান। বর্তমানে অনেকেই নিজের পছন্দের কারণে নয়, বরং বাড়ি কেনার সামর্থ্য না থাকায় বাধ্য হয়ে ভাড়ার বাজারে প্রবেশ করছেন। অর্থাৎ, ভাড়ার বাজার এখন অনেকের জন্য একটি বিকল্প নয়, বরং একমাত্র আশ্রয়। ফলে চাহিদা বেশি থাকলেও আর্থিক সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা ভাড়াটিয়াদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
সমীক্ষায় উঠে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। প্রায় ৪২ শতাংশ ভাড়াটিয়া জানিয়েছেন, তারা মাসিক ভাড়ার জন্য সর্বোচ্চ ১,৫০০ কানাডিয়ান ডলার ব্যয় করতে সক্ষম। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে কানাডায় গড়ে যে ভাড়া দাবি করা হচ্ছে, তা ২,০০০ ডলারেরও বেশি। ফলে একজন ভাড়াটিয়ার পরিকল্পিত বাজেট এবং বাজারে বিদ্যমান ভাড়ার মধ্যে প্রায় ৫০০ ডলারের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এই ব্যবধানই বহু মানুষকে কাঙ্ক্ষিত এলাকায় বাসা ভাড়া নেওয়া থেকে বঞ্চিত করছে অথবা ছোট ও কম সুবিধাসম্পন্ন বাসায় যেতে বাধ্য করছে।
সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে কানাডায় জাতীয়ভাবে দাবিকৃত গড় মাসিক ভাড়া দাঁড়িয়েছে ২,০২৯ কানাডিয়ান ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৭ শতাংশ কম। এটি ছিল টানা ২০তম মাস, যখন জাতীয় গড় ভাড়া আগের বছরের তুলনায় কমেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৪ সালের মে মাসে গড় দাবিকৃত ভাড়া সর্বোচ্চ ২,২০২ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। সেই সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে এখন পর্যন্ত ভাড়া প্রায় ৭.৮ শতাংশ কমেছে।
ভাড়া কমার ধারাবাহিকতা ইতিবাচক হলেও তা এখনো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারেনি। কারণ একই সময়ে জীবনযাত্রার অন্যান্য ব্যয়, খাদ্যদ্রব্যের মূল্য, পরিবহন খরচ এবং ঋণের সুদের চাপ অনেক পরিবারের আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিয়েছে। এছাড়া বাড়ি কেনার উচ্চমূল্য এবং কঠিন মর্টগেজ শর্তের কারণে বহু মানুষ ভাড়ার বাজারেই থেকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে ভাড়ার চাহিদা কমছে না, বরং অনেক এলাকায় তা স্থায়ীভাবে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। কানাডার আবাসন সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শুধু ভাড়া কমানো যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি নতুন ভাড়ার আবাসন নির্মাণ বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী আবাসনের সরবরাহ বাড়ানো এবং মধ্যম আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শক্তিশালী করার মতো নীতিগত উদ্যোগও সমানভাবে প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সমীক্ষা স্পষ্ট করে দিয়েছে, পরিসংখ্যানগতভাবে ভাড়া কমলেও কানাডার অধিকাংশ ভাড়াটিয়ার জন্য আবাসন এখনো নাগালের বাইরে। বাজেটের সঙ্গে বাজারদরের বড় ব্যবধান, সীমিত সরবরাহ এবং আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য মিলিয়ে আবাসন সংকট এখনো কাটেনি। ফলে আগামী দিনে শুধু ভাড়ার হার নয়, মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণই হবে কানাডার আবাসন নীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

