
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সম্পর্ক ছিল যেন নিখুঁত প্রেমের গল্প। বাগদান, ফুলের তোড়া, একসঙ্গে নাচ, ভালোবাসার বার্তা—সবকিছুতেই ফুটে উঠেছিল সুখী ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু সেই সম্পর্কের আড়ালেই চলছিল ভয়াবহ এক হত্যার পরিকল্পনা—এমনটাই দাবি করছে ভারতের পুলিশ।
মহারাষ্ট্রের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান কেতন বিশাল আগারওয়ালের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাগদত্তা সিয়া গোয়াল ও কথিত প্রেমিক চেতন বাবুলাল চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সিয়া ও কেতন তাদের বাগদানের ঘোষণা দেন। আগামী নভেম্বর মাসে জমকালো আয়োজনে তাদের বিয়ের পরিকল্পনা ছিল। বিয়ের অতিথিদের জন্য দুটি প্রাইভেট বিমান ভাড়া এবং জয়পুরের একটি প্রাসাদ ১৭ কোটি রুপিতে বুক করা হয়েছিল বলেও জানা গেছে।
বাগদানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিয়া নিয়মিত কেতনের সঙ্গে ছবি প্রকাশ করতেন। একটি পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, তার হৃদয় তার ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার এক মাস পূর্তি উদযাপন করছেন। অন্য এক পোস্টে কেতনের দেওয়া ফুলের ছবি দিয়ে ভালোবাসার বার্তাও দেন তিনি।
কিন্তু সেই হাসিখুশি ছবির আড়ালে যে সম্পর্কের সমীকরণ বদলে যাচ্ছিল, তা কেউ বুঝতে পারেনি। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, সিয়ার সঙ্গে চেতন বাবুলাল চৌধুরীর সম্পর্ক ছিল। গত বছর একটি ব্যবসায়িক বৈঠকের মাধ্যমে তাদের পরিচয় হয় বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চেতন কেতনকে তাদের সম্পর্কের পথে বাধা হিসেবে দেখতেন। অন্যদিকে সিয়াও কেতনকে বিয়ে করতে আগ্রহী ছিলেন না বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
গত ১৮ জুন পুনের কাছে লোহাগড় দুর্গ এলাকায় খাদে পড়ে কেতনের মৃত্যু হয়। শুরুতে এটিকে দুর্ঘটনা বলে মনে করা হয়েছিল। সিয়া পুলিশকে জানিয়েছিলেন, ছবি তুলতে গিয়ে প্রবল বাতাসে ভারসাম্য হারিয়ে কেতন নিচে পড়ে যান।
তবে তদন্তকারীদের সন্দেহ হয় সিয়ার আচরণে। কেতনের মৃত্যুর পরও তার মধ্যে প্রত্যাশিত শোকের প্রকাশ দেখা যায়নি বলে পুলিশের দাবি। এরপর তদন্তে বেরিয়ে আসে সিয়া ও চেতনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের তথ্য।
পুলিশ জানায়, বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে সিয়া কেতনকে লোহাগড় দুর্গে নিয়ে যান। পরে চেতন ছদ্মবেশে সেখানে পৌঁছে তাদের অনুসরণ করেন। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে হুডি পরা অবস্থায় দেখা গেছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, সুযোগ বুঝে সিয়া ও চেতন কেতনকে ধাক্কা দিয়ে খাদে ফেলে দেন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
তদন্তে আরও জানা গেছে, গত সাত মাসে সিয়া ও চেতন ২ হাজার ৪টি ফোনকল করেছেন। এসব কথোপকথনের মোট সময় প্রায় ২৩৮ ঘণ্টা বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কেতনের বাবা বিশাল আগারওয়াল দাবি করেছেন, এর আগেও তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। ৬ জুন বালিতে প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটে যাওয়ার সময় কেতনের পাসপোর্ট হারিয়ে যায়। পরিবারের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবেই পাসপোর্ট সরানো হয়েছিল।
পুলিশের দাবি, ১৪ জুন লোহাগড় দুর্গে প্রথমবার কেতনকে ধাক্কা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তবে সেদিন তিনি ঝোপ আঁকড়ে বেঁচে যান। পরে ঘটনাটি আড়াল করতে সিয়া সাপ দেখার ভান করে তাকে জড়িয়ে ধরেন বলে তদন্তকারীদের দাবি।
প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর বিকল্প পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। অবশেষে ১৮ জুন দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় কেতন নিহত হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাজকীয় বিয়ের প্রস্তুতি যখন শেষ পর্যায়ে, তখনই এমন ঘটনায় দুই পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। জয়পুরের প্রাসাদ বুকিং থেকে শুরু করে বিয়ের সব আয়োজন ভেঙে গেছে এক মর্মান্তিক অভিযোগের কারণে।
পুলিশ সিয়া গোয়াল ও চেতন বাবুলাল চৌধুরীর বিরুদ্ধে হত্যা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মামলা দায়ের করেছে। মামলার তদন্ত চলছে।

