বাধ্য করা শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা কঠোর করছে কানাডা

বাধ্য করা শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা কঠোর করছে কানাডা - the Bengali Times
পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনীতা আনান্দ বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে প্যারিস সফরে থাকায় তার পক্ষে সংসদীয় সচিব বব ওলিফ্যান্ট বিলটি উত্থাপন করেন

বাধ্যতামূলক বা জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি বন্ধে কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে কানাডা সরকার। এ লক্ষ্যে শুক্রবার ফেডারেল সরকার পার্লামেন্টে একটি নতুন বিল উত্থাপন করেছে, যা কার্যকর হলে বিদেশে বাধ্যতামূলক শ্রমে তৈরি পণ্য কানাডার বাজারে প্রবেশ করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক আরোপের হুমকি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মানবাধিকার ইস্যু ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নিয়েছে অটোয়া।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনীতা আনান্দ বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে প্যারিস সফরে থাকায় তার পক্ষে সংসদীয় সচিব বব ওলিফ্যান্ট বিলটি উত্থাপন করেন। পার্লামেন্ট হিলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ওলিফ্যান্ট বলেন, এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যার কানাডীয় সমাধান। তার ভাষায়, “বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে। কানাডা সেই পণ্যের গন্তব্য হতে চায় না।”

- Advertisement -

নতুন বিল অনুযায়ী, বিশ্বের এমন অঞ্চলগুলোর একটি তালিকা তৈরি করা হবে যেখানে বাধ্যতামূলক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ বা প্রমাণ রয়েছে। কানাডার দূতাবাস, গোয়েন্দা তথ্য, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এই তালিকা প্রস্তুত করা হবে। তালিকাভুক্ত অঞ্চল থেকে আসা নির্দিষ্ট পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব বর্তাবে। তাদের প্রমাণ করতে হবে যে সংশ্লিষ্ট পণ্যটি বাধ্যতামূলক শ্রম ব্যবহার করে তৈরি করা হয়নি। এর ফলে আমদানিকারকদের সরবরাহ চেইন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করতে হবে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমানে কানাডিয়ান সীমান্ত কর্মকর্তারা বিভিন্ন কনটেইনার ও চালান পরিদর্শনের মাধ্যমে সন্দেহজনক পণ্য শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। তবে নতুন আইন কার্যকর হলে এই ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের কাছে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল ও পণ্যের একটি নির্দিষ্ট তালিকা থাকবে। ফলে এলোমেলো বা সাধারণ পরিদর্শনের পরিবর্তে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি বাড়ানো হবে। এতে সীমান্তে নজরদারি আরও কার্যকর হবে বলে মনে করছে সরকার।

ওলিফ্যান্ট স্বীকার করেছেন যে বিলটি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ দূর করতেও ভূমিকা রাখতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রশাসন বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির অভিযোগ তুলে শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে। বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত উৎপাদন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বারবার বলেছে ওয়াশিংটন। ফলে কানাডাও বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে নিজস্ব অবস্থান স্পষ্ট করতে আগ্রহী। ওলিফ্যান্ট বলেন, “বাধ্যতামূলক শ্রমে উৎপাদিত সস্তা পণ্য কিংবা অস্বাভাবিক কম দামের সামগ্রী কানাডার বাজারে ডাম্পিং হোক, আমরা তা চাই না।”

নতুন আইন কার্যকর হলে আমদানিকারকদের জন্য নিয়ম-কানুন আরও কঠোর হতে পারে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানি আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরশীল, তাদেরকে উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত নথিপত্র সংরক্ষণ করতে হবে। ব্যবসায়িক মহলের একাংশ মনে করছে, এতে আমদানি প্রক্রিয়া কিছুটা ব্যয়বহুল ও জটিল হতে পারে। তবে মানবাধিকার সুরক্ষা এবং ন্যায্য বাণিজ্য নিশ্চিত করার স্বার্থে এই পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় বলেও অনেকে মত দিয়েছেন।

সরকার এখনও নতুন ব্যবস্থাটি কার্যকর হওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করেনি। বিলটি এখন সংসদীয় কমিটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাবে। আগামী সপ্তাহে গ্রীষ্মকালীন বিরতির আগে হাউস অব কমন্সে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির এথিক্স বিষয়ক সমালোচক মাইকেল ব্যারেট জানিয়েছেন, তারা বিলটির প্রতিটি ধারা খতিয়ে দেখবেন এবং সংসদীয় আলোচনায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবেন।

বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের কিছু শিল্পাঞ্চলে জোরপূর্বক শ্রম, শ্রমিক নির্যাতন এবং অস্বচ্ছ উৎপাদন ব্যবস্থার অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কানাডার নতুন বিল সেই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি শুধু মানবাধিকার সুরক্ষার বার্তা দেবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সুসংহত করতেও সহায়ক হতে পারে। তবে আইনটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর নজরদারি সম্ভব হবে এবং ব্যবসায়িক ব্যয় কতটা বাড়বে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে আগামী মাসগুলোতে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles